- Home
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- মুক্তিযুদ্ধঃ সত্যি গল্পের অভিজ্ঞতা
মুক্তিযুদ্ধঃ সত্যি গল্পের অভিজ্ঞতা
- By National Days
- Published 03/26/2008
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- Unrated
‘Talks are progressing’ এই খবর শুনে আমার স্বামী ঢাকা রওনা হলেন। উদ্দেশ্য ছিল দুটো চট্টগ্রাম বন্দরে আসা নতুন গাড়ি আনা এবং সেই সাথে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান দেখা। আমরা তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের প্রাক্কালে উপরোক্ত কথাটা বলা হয়েছিল। কিন্তু ২০ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া চতুর্থ বৈঠক কিভাবে ব্যর্থ হলো, মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো বৈঠকও কিভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো এবং তার পরবর্তী ঘটনা কিভাবে ঘটেছিল তা সবার জানা। সেসব বিষয়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। ডকুমেন্ট সংগৃহীত হয়েছে। আমি সেসব লিখব না। আমি আজকে লেখা সাজাবো আমাদের মতো লাখো সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের লাখো অভিজ্ঞতার কিছু সত্যি গল্প দিয়ে।
আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল সে সময়ের ইকবাল হল ছিল পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের, বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রভূমি। স্বনামধন্য রাজনৈতিক ছাত্রনেতাদের অনেকেই এই হলে থাকতেন এবং বঙ্গবন্ধুও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার সাথে এখান থেকেই যোগাযোগ রাখতেন। এই খবরটি পাকিস্তানি জান্তার অজানা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক আমার স্বামীর বন্ধু হাউস টিউটর হওয়ার সুবাদে এই হলের কম্পাউন্ডে অবস্থান করতেন। আমার স্বামী উঠলেন সেই বন্ধুর বাসায়। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক কোনোক্রমেই আগায়নি বরং ফেল করেছে এবং যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো মারাত্মক পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে এটাই ছিল বাস্তবতা। ২৪ মার্চ তিনি তার একজন সিএসপি বন্ধুর কাছে গাড়ির লাইসেন্স আনতে গেলেন। বন্ধুটি রেগেমেগে বললেন, গাড়ির লাইসেন্সের কথা ভুলে যাও, প্রাণের লাইসেন্স ঠিক রাখো। উঠেছ কোথায়? ইকবাল হলে ওঠার কথা জানতে পেরে বন্ধুটি হেসে বললেন, ‘ঠিক জায়গামতো উঠেছ। এখন দয়া করে আমার বাসায় চলো। শোনা যাচ্ছে, আজকালের মধ্যে অপারেশন হবে আর ওই হলটিই হচ্ছে প্রথম টার্গেট।’ হাউস টিউটর বন্ধুটির স্ত্রী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। একেবারে অনংথষধপন ঢ়য়থবপ.
ঢাকা থেকে তিনি কিভাবে রাজশাহী গেলেন সে এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা। অল্পস্বল্প বাস চলাচল শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড ভিড়। তার পরও যেতে তো হবে। বাস ছাড়ার পর যাত্রীদের মনে হচ্ছিল বাস যেন উড়ে যায়। ঢাকা ছেড়ে যেতে পারলেই তো আপাতত জীবনটা রক্ষা পাবে। জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হলে বোঝা যায় মানুষ তার জীবনকে কত ভালোবাসে। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে এমন জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাঙালিকে বহুবার। যা হোক বাস ডেমরা ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিটি যাত্রীর এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ব্রিজের নিচে অসংখ্য লাশ ফুলে ভেসে আছে। কী যে নিষ্ঠুর সেসব দৃশ্য! বাস, রিকশা, টেম্পো, হেঁটে যেখানে যেভাবে যাওয়া যায় সেভাবে বিশাল যমুনার পাড় পর্যন্ত যাওয়া গেল। যমুনা পার হতে হয়েছিল নৌকায় যেটা ছিল স্বাভাবিক সময়ে অকল্পনীয়। যমুনার এপারেই মুক্তাঙ্গন। মুক্ত এলাকায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ায় সেখানে জীবনের স্বাদই ছিল ভিন্ন। পাবনা জেলার নগরবাড়ী ঘাট। ঘাটের কাছাকাছি একটা জায়গা। নাম ডাববাগান। পাকবাহিনীকে এপারে আসতে হলে এই ঘাটই ব্যবহার করতে হবে। তাই সেখানে চলছিল প্রতিরোধের প্রস্তুতি। বাঙ্কার কেটে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ যেটুকু যেখানে পাওয়া গেল সব এনে মজুদ করা হলো। বলা প্রয়োজন, পরবর্তী সময়ে সেখানে যুদ্ধ হয়েছিল। বীর মুক্তিসেনারা পাকবাহিনীকে কয়েক দিন ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে পাকসেনারা যে ক’টি স্থানে ভালো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল ডাববাগান ছিল তার অন্যতম। পাকবাহিনীর কনভয়গুলো যেন উত্তরবঙ্গে (তখন যমুনা ব্রিজ ছিল না) সহজে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য রাস্তার ওপর আড়াআড়িভাবে স্থাপন করা হয়েছিল কাটাগাছ। পুরো উত্তরবঙ্গে এভাবেই গাছ কেটে রাস্তার ওপর ফেলে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছিল। যা হোক আমাদের এক নিকট-আত্মীয় অতিকষ্টে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে আমার স্বামীকে রাজশাহী পৌঁছে দিয়েছিল। তখন উত্তরবঙ্গ ছিল মুক্ত। কোনো যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হলে মুক্তিবাহিনীর সার্টিফিকেট লাগত। সেটি তারা জোগাড় করেছিল। যাকে মৃত ভেবেছিলাম তাকে সামনে দাঁড়ানো দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বিবিসি বা অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ঢাকা ম্যাসাকার হওয়ার খবরে স্বাভাকিকভাবে ধরে নিয়েছিলাম তিনি হয়তো বেঁচে নাই। তবে মনের কোণে একটা ক্ষীণ আশা সব সময় জাগরূক ছিল। মনে হতো খোদাতায়ালা আমার শিশুটির জন্য হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমরা অনেক ভাগ্যবান। এমন অনেক পরিবার ছিল যারা সারা জীবন প্রতীক্ষা করেও তাদের প্রিয়জনের দেখা পায়নি। পাকবাহিনী হিন্দু, মুসলিম, নির্বিশেষে গণহত্যা চালাচ্ছে। তবে হিন্দু শুনলে তার কোনোভাবেই রক্ষা ছিল না। বিশ্রাম না নিয়েই তিনি হিন্দু কলিগদের খবরটা অতি শিগগির পৌঁছে দেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যাম্পাস ত্যাগ করে ভারতে চলে যেতে বলেন। রাজশাহীতে মিলিটারিরা অনেকটা বন্দী অবস্থায় ছিল। মাঝে মাঝে খাবারের খোঁজে এসে দোকানপাট লুট করে আবার ব্যারাকে ফিরে যেত। শুধু অপেক্ষায় ছিল ড়প-মষফসড়শথয়মসষকবে আসবে। আসার সাথে সাথে তারা ক্যাম্পাসসহ অন্য সব স্থানে ব্যাপক অপারেশনের পরিকল্পনা নিচ্ছিল। ক্যাম্পাস ছিল তাদের প্রধান টার্গেট। কেননা তাদের ধারণা শিক্ষকরাই ছাত্রদের মন্ত্রণাদাতা। ছয় দফার মন্ত্র তারাই তো ছাত্রদের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে!
মুখে মুখে খবর আসে পাকবাহিনী কতদূর অগ্রসর হয়েছে। রাস্তার দু’ধারের সব গাছ কেটে, দু’ধারের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে তারা অগ্রসর হচ্ছে। পথে পথে প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে তবে অল্প প্রস্তুতির জন্য মুক্তিবাহিনী জীবন দিচ্ছে বা পিছু হটছে। ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। একদিন এপ্রিলের মাঝামাঝি খবর এলো আজই মিলিটারি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে। ক্যাম্পাস অনেকটাই খালি হয়ে এসেছে। হিন্দু শিক্ষকমণ্ডলী ক্যাম্পাস এবং দেশত্যাগ করেছেন। আমাদের ছেলেটি একেবারে শিশু। কোথায়, কিভাবে যাব দিশেহারা। তবে ক্যাম্পাসে যে থাকা নিরাপদ নয় সেটা নিশ্চিত। জীবনের দায় বড় দায় তাই জীবনবাজি রেখে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। তবে তার জন্য কিছুটা প্রস্তুতি দরকার। আপাতত পাশের গ্রামে যাওয়া ঠিক করা হলো। একজন শিক্ষকের স্ত্রীর সন্তান হওয়ার সময় অত্যাসন্ন। তাদের অবস্থা আরো করুণ। নিঃস্ব গ্রামবাসী হৃদয় নিংড়ানো উষ্ণতা দিয়ে আমাদের জায়গা দিলো। এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে বেশি দিন থাকা যাবে না জেনে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম এবং গ্রামের বাড়ি যাওয়ার ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে থাকলাম। আমাদের একজন কলিগ অর্থনীতির প্রফেসর শিশুটির প্রতি দয়াপরবশ হয়ে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। যদিও জানা কথা পুরোটা রাস্তা পাবনার বেড়াতে গাড়িতে যাওয়া যাবে না। হয়তো বা অর্ধেক রাস্তা অথবা কিছু দূর গিয়েই গাড়িটা রাস্তায় ফেলে যেতে হতে পারে। প্রফেসর সাহেব এবং আমার স্বামী গাড়িতে পেট্রল নেয়ার জন্য শহরে গেলেন। পড়বি পড় যমের মুখে। সেই সময় মিলিটারি খাবারের সন্ধানে খাবার দোকান লুট করতে বের হয়েছে। তারা গাড়ি থামিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করল। যখন জানতে পারল দু’জনই প্রফেসর, একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আর একজন অর্থনীতির। তারা মোক্ষম সুযোগটা পেয়ে গেল বলেই ফেলল। প্রফেসর, ও ভিতো মাংতা হ্যায়। আর যায় কোথায়! কোথা থেকে একটা মানুষ ভর্তি ট্রাক এসে সামনে থামল। দুই প্রফেসরকে সেই ট্রাকে উঠতে হুকুম করা হলো। সেই ট্রাকে আওয়ামী লীগের ছাড়াও ছিল সাধারণ মানুষ। ট্রাক চলল বধ্যভূমির দিকে। কিছুদূর চলার পর দুই প্রফেসর আসন্ন মৃত্যু জেনে ভয়ে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলে উঠল উচ্চৈঃস্বরে। প্রতিটি মুসলমানের মনে হয় অতি বিপদে অন্তরের অন্তস্তলের কথা প্রকাশ পায়। যা হোক এ কথা শুনে একজন মিলিটারি বলে উঠল, ওদের তো মুসলমান বলেই মনে হচ্ছে। এই বলেই দু’জনকে লাথি দিয়ে ট্রাকের ওপর থেকে ফেলে দিলো। তারা কিছুটা আহত হলেন। তবে সে কথা তাদের মনেই হয়নি। নিচে পড়ার সাথে সাথে উঠেই ঊর্ধ্ব শ্বাসে দৌড় এবং এক দৌড়ে বাসায় পৌঁছে গেলেন। বলা বাহুল্য শহর থেকে ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় তিন মাইল। নিজের জীবন দ্বিতীয়বারের মতো ফিরে পেয়ে এই ক্যাম্পাসে আর এক মুহূর্ত না থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কী আর করা ঘোড়ার গাড়িই হবে বাহন। গাড়ি আনতে ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়ামাত্রই হেলিকপ্টার থেকে শেল নিক্ষেপ করা হলো। কয়েকজন রিকশাওয়ালা ও ঘোড়ার গাড়িওয়ালা আহত ও নিহত হন। ওই বাজারে আর যারা ছিল অনেকেই পাশের এঁদো পুকুরে ডুব দিয়ে প্রাণ রক্ষা করল। সে এক অরাজক অবস্থা। সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। ঘরে ঘরে বাংলাদেশের সবুজের মধ্যে লাল-হলুদের পতাকা উড়ছে। আমার একটা দামি সিল্কের সবুজ শাড়ি ছিল। কেটে কেটে পতাকা বানিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করা হলো। জেলের তালা খুলে দেয়া হলো। সব কয়েদি বের হয়ে জয় বাংলা বলে প্রসেসন করতে থাকল। সবার মধ্যে একটা বিরাট কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আবার ভয়মিশ্রিত শঙ্কা বাঙালির প্রাণমনকে ঘোর অমানিশায় ডুবিয়ে দিলো। সে এক অপূর্ব অনুভূতি। এ অমানিশার মোকাবেলা কেমন করে করা হবে জানা নেই। তার পরও সোনালি স্বপ্নের ব্যঞ্জনা প্রাণমনকে আন্দোলিত করে। যা হোক চার দিন পর রাজশাহী থেকে পাবনার বেড়াতে পৌঁছে গেলাম। পথে কোনো জায়গায় স্কুলঘরে বা মাদ্রাসায় রাত কাটানো এবং খিচুড়ি রান্না করে খাওয়া। কোনো কোনো দিন সচ্ছল গৃহস্থের ঘরে আতিথেয়তাও গ্রহণ করেছি। এসব বিপদগ্রস্ত কাফেলার জন্য দিনরাত কোনো সময়ই কোনো ভয় ছিল না। পথের ধারে কেউ কেউ পানি, গুড়, চিঁড়া, মুড়ি নিয়ে বসে থাকত। কেউ কেউ শুধু পথ প্রদর্শনের কাজ করত। পাবনা শহরে পলায়নপর মিলিটারি কনভয় আক্রমণ করে সবাইকে পরপারে পাঠানো হয়েছে। তবে বিরাট কোনো মিলিটারি অপারেশনের আশঙ্কায় শহর মানুষশূন্য ছিল। কখনো ঘোড়ার গাড়ি। কখনো হেঁটে, কখনো বা রিকশা, শেষ পর্যন্ত গরুর গাড়িতে আসি গ্রামের বাড়ি। আমার বাড়ি ছিল ঢাকা-বগুড়া-দিনাজপুর হাইওয়ে সংলগ্ন। সেখানে যাওয়া নিরাপদ কি না আগেই খোঁজ নেয়া হলো। মিলিটারি আসেনি তবে আসি আসি করছে। প্রতিরোধের জন্যও জনতা প্রস্তুতি নিচ্ছে। শত-সহস্র মানুষ রাস্তার ওপর প্রতিদিন জমায়েত হচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র। অস্ত্র বলতে দা, কাস্তে, শাবল, লাঠি আর গুটিকতক বন্দুক। তাতে কী? জনতা একসাথে হলে কী যে প্রচণ্ড শক্তিতে রূপ নেয় তা বলার নয়। বাঁধভাঙা প্রাণের জোয়ার। দেশের শত্রুদের কিভাবে প্রতিরোধ করা হবে এই উত্তেজনায় জনতা ফেটে পড়ছে। আবার বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে আধামাইল ভেতরে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। সেখানেও বিপদ আসতে পারে ভেবে দুই মাইল ভেতরে ফসলের ক্ষেত মাড়িয়ে এক কৃষকের বাড়ি ঠিক করা হলো, যেন মিলিটারি রাস্তায় আসার খবর পেলেই সেখানে পালাতে পারি। আমার স্বামীর সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস ছিল। গ্রামে অনেক সময় সিগারেট পাওয়া যেত না। বিড়িই খেতেন। তবে বাড়ির মুরব্বিদের সামনে তো আর খাওয়া চলে না। তাই বাড়ি সংলগ্ন আমবাগানে গিয়ে খেতেন। একদিন ওই বাগান থেকে হঠাৎ দেখতে পেলেন কয়েকটি আর্মি কনভয় এসে বাড়ির সামনে রাস্তায় থামল। সেখানে রাস্তার ধারে দু’জন নিরীহ গ্রামবাসী বসা ছিল। কয়েকজন জোয়ান নেমে তাদের কি যেন জিজ্ঞেস করল। হয়তো বা তারা প্রশ্ন বুঝতেই পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে দু’জনকে গুলি করে হত্যা করে কনভয়গুলো চলে গেল। এ ঘটনায় বাড়ির সবাই হতবিহ্বল হয়ে গেল। শোনা গেল ওই কনভয়গুলো ছিল অগ্রগামী বাহিনী। পেছনে বিশাল বাহিনী আসছে। রাস্তার দু’ধারে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাস্তার ধারের গ্রামের বাসিন্দারা আরো ভেতরের দিকে চলে গেল। উৎসাহী কিশোর-যুবকরা রাস্তার দিকে দূর থেকে নজর রাখত যখনই কোনো মিলিটারির বাহন আসতে দেখত এক দৌড়ে গ্রামবাসীকে জানিয়ে দিত। গ্রামবাসী প্রাণের ভয়ে আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যেত। আমরা সব সময় এসব মষফসড়শপড়দের ওপর নির্ভর করতাম। তারা দিনরাত পালা করে এই কাজ নিষ্ঠার সাথে করত। শিশু ছেলের জন্য একটা ব্যাগ সব সময় প্রস্তুত রাখতাম। তাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, গুঁড়োদুধ ও গরম পানি, কিছু জামাকাপড় থাকত। আর মেয়েদের সাথে থাকত গয়নার পোঁটলা। রাত নেই, দিন নেই যখনই খবর আসত তখনই দৌড়াতে হতো। এ যেন পুরো বাংলা দেশেরই চিত্র। শুনতে পেলাম এমনভাবে পালাতে গিয়ে এক মা ক্লান্ত, শ্রান্ত, উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল যে, নিজের এবং নিজের শিশুটির ভার বইতে পারছিল না। ফলে পার হতে গিয়ে কখন যে অজান্তে কোলের শিশুটি পানিতে পড়ে গেছে টেরই পায়নি। যারা পেছনে ছিল তাদের একজনের পায়ের নিচে পানির ভেতর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। আমি একদিন পালানোর ঘটনা বলি। আমাদের পথে পড়ত একটি ঠাকুর বাড়ি। আমরা যখন পালাচ্ছিলাম ঠাকুর মশাই তার পুরো পরিবার নিয়ে দিব্বি বাড়িতে অবস্থান করছেন। আমরা যাওয়ার সময় তাকে সতর্ক করে দিয়ে গেলাম তিনি যেন অতি শিগগিরই এ জায়গা ত্যাগ করেন। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, মিলিটারি আমাকে মারবে কেন?’ আমরা আর সময় নষ্ট না করে পালিয়ে গেলাম। মিলিটারি গ্রাম অতিক্রম করে চলে গেলে আমরা ফিরে এলাম আবার সেই ঠাকুর মশাইয়ের বাড়ির ওপর দিয়ে। আসার সময় যে দৃশ্য দেখলাম তা লোমহর্ষক। ঠাকুর এবং তার পরিবারের সদস্যদের বাড়ির আঙিনার আমগাছের সাথে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। লাশগুলো আধাঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সৎকারের কোনো লোক নেই। সেখানে সেভাবে কত দিন লাশগুলো ছিল কে জানে।
আরো একদিনের গল্প বলি। যাদের ঘরে ছোট শিশু ছিল তারা পালানোর সময় শিশুর জন্য পানি আর দুধ নিয়েই পালাত। মিলিটারি আসছে শুনে সবাই গ্রামের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে গেল। আমার এক ফুফুর দিকে তাকিয়ে দেখি তার দুই হাতে ধরা মাটির পাতিলের উপরিভাগ। কখন যে পাতিলের নিচটুকু শিশুর দুধসহ খুলে পড়ে গেছে তিনি টেরই পাননি। পুরো কাপড় দুধ আর পাতিলের তলার কালিতে একাকার।
মুক্তিযুদ্ধ পুরোপুরি শুরু হয়ে গেছে। শহরের চেয়ে গ্রাম যেন বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠল। এ দেশীয় মষফসড়শপড়দের সহায়তায় গ্রামে অপারেশন চলতে থাকল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা নিধন করার নামে নারী, শিশু, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ সবার প্রাণ সংহার হতে থাকল। যে বাড়িতে যুবতী মেয়ে এবং বধূ ছিল তাদের দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না। এ অবস্থায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অধিকতর নিরাপদ মনে করে সেখানে ফিরে গেলাম। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার আর এক অধ্যায়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ক্যান্টনমেন্ট। হলগুলো পরিপূর্ণ ছিল গোলাবারুদ আর দূরপাল্লার কামানে। সীমান্তের ওপার থেকে কামানের শব্দ হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও দূরপাল্লার কামান ছোড়া হতো। পুরো ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হতো, জানালার কাচগুলো ভেঙে যেত। বিনিদ্র রজনী কাটানো শুরু হলো বেশি করে। বাসায় ফিরে এসে দেখি জিনিসপত্র ভাঙা লণ্ডভণ্ড। কিছু জিনিস লুট হয়েছে। তার মধ্যে একটা টাইপরাইটারও ছিল। আমার স্বামীকে মিলিটারি ধরে নিয়ে যায়। তারই নামে একজন শিক্ষক ছিল মিলিটারির ব্ল্যাক লিস্টে। দু’বারই সে সময়ের ভিসি সাহেবের সুপারিশে ছাড়া পেয়ে যায়। যখন তারা শুনল তিনি বই লেখেন, তারা তাকে দারুণভাবে অনুরোধ করল যেন তিনি ‘আচ্ছা কারকে’ একটা বই লেখেন মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। টাইপরাইটারটাও ফেরত দিয়ে গেল। মাঝে মাঝে খবর নিত বই লেখা কতদূর হলো। আমাদের বাসার গেটের সামনে দু’দিকে দুটো শিশুগাছ নিজ হাতে লাগিয়েছিলাম। গাছ দু’টি প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে আর প্রচণ্ড খরতাপে ছায়া বিতরণ করে। সেই ছায়ায় মিলিটারি জিপ এসে থামত। নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হতো কেন গাছ দুটো লাগিয়েছিলাম। এখন তো কাটাও যাবে না। জিপগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত না যেত তকক্ষণ তীব্র উৎকণ্ঠায় সময় কাটাতে হতো। মাঝে মাঝে নিচতলায় বাগানের ভেতর মিলিটারি ঢুকে যেত। ঘাসগুলো অনেক বড় বড় হয়ে গিয়েছিল। কাটানোর কোনো লোক পাওয়া যেত না। ওই ঘাসে তারা ‘মুকুত লোক’ খুঁজত। ওপরতলায় দরজা-জানালা বন্ধ করে নিঃশব্দে ওদের বের হয়ে যাওয়ার প্রহর গুনতাম। আমাদের বাসার ঠিক মুখোমুখি বাংলার এক প্রফেসরের বাসা ছিল। তিনি বাসায় থাকতেন না। সেই বাসা মিলিটারির টর্চার সেল ছিল। সেসব দিনে সন্ধ্যার পরই ঘোর অমানিশা আসত। কেউ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে না, চলাফেরা নীরবে করে। রাত ১০টার পর ওই বাসা থেকে হুইপিংয়ের শব্দ ভেসে আসত আর শোনা যেত অন্তরফাটা গোঙ্গানি। আশপাশের এলাকা থেকে লোকজন বিশেষ করে যুবকদের ধরে আনা হতো। দিনে ইনটারোগেট করা হতো আর বাগানে ঘাস কাটানো হতো, রাতে চলতো টর্চার। বেতের মধ্যে লোহা গেঁথে পিঠ ও বুকের ওপর দিয়ে টান দিয়ে ছিলে ফেলা হতো। স্বাধীনতার পর ওই বাড়ির পেছনের বারান্দায় ওই দেয়ালের মাঝখানে হাঁটুসমান রক্ত জমাট বাঁধা ছিল। একদিন আমাদের বাসার কাজের ছেলেটি অন্য একটি ছেলের সাথে হাঁটতে হাঁটতে জোহা হল এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। এরপর মিলিটারি ধরে নিয়ে গেল। যখন বুঝতে পারল ওরা নিতান্তই নিরীহ ছেলে বাসায় কাজ করে তখন ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু তার আগে তাদের রুটি আর বুটের ডাল খাইয়ে সাড়া রাত গোলাবারুদ একতলা থেকে তিনতলায় উঠিয়ে নিয়েছে। এই সংবাদটি অবশ্য পরে আমার কাছে বলেছিল। বাংলাদেশে তখন আমাদের দুঃসাহসী কিছু মুক্তিযোদ্ধা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। একদিন এক দারুণ ঘটনা ঘটল। একজন মুচি আমাদের বাসায় ঢুকল। ক্যাম্পাসে মুরগিওয়ালা, ফলওয়ালা, তরকারিওয়ালারা ফেরি করতে আসত। প্রথমদিকে ভয়ে না এলেও ক্ষুধার তাগিদে ধীরে ধীরে ওরা আসতে শুরু করল। আমরা যেহেতু বাইরে প্রায় যাই না, তাই জুতা সারানোর প্রয়োজনও ছিল। জুতা সারানোর পর জুতাওয়ালাকে দাম দিতে গেলাম। সে বলে উঠল, ‘আপা আমাকে চিনতে পারলেন না, আমি অমুক। আমাকে খাবার দেন আর ক্যাম্পাসে মিলিটারির অবস্থানের খবর দেন।’ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এমন নিখুঁতভাবে মুচি সেজেছে যে তাকে চেনা দায়। সেই শুরু হলো। কখনো মুরগিওয়ালা, কখনো ফলওয়ালা সেজে মাঝে মাঝে এসে খবরাখবর নিয়ে যেত। খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কোনোভাবে যদি জানতে পারে তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু। ভয়ের আরো কারণ ছিল। ছাত্রীজীবনে একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনের হল শাখার যুগ্ম সম্পাদিকা, সাধারণ সম্পাদিকা ও প্রেসিডেন্ট ছিলাম। পাস করার পর একটি রাজনৈতিক দলের রাজশাহী সিটি মহিলা শাখার প্রেসিডেন্ট ছিলাম। সুতরাং অনেক ছেলেই আমার পরিচিত ছিল যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল। বাসার সবার অলক্ষ্যে শিশুর কাঁথাকাপড়ের মধ্যে পিস্তলও লুকিয়ে রেখেছি। প্রায় প্রতিটি বাঙালি ঘর ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্গ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র ঘরের মধ্যে পাহারা দিয়েছি। অসংখ্য বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না হয়েছে। এভাবে সরাসরি না হোক পরোক্ষভাবে প্রতিটি পরিবার ছিল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। ক্যাম্পাসে প্রতিটি রাত থাকত ভয়ঙ্কর বিভীষিকা নিয়ে। মনে হতো আজকের রাতটা হয়তো আর পার হবে না। যখন সকালের সূর্য দেখতাম মনে হতো একটা দিন আয়ু বাড়ল। আমি নিশ্চিত এমন অনুভূতি প্রতিটি ঘরের বাসিন্দাদের মনেই ছিল। যুদ্ধ যে কী ভয়ঙ্কর এর চড়সধপঢ়ঢ়-এর মধ্যে যার অভিজ্ঞতা হয়নি সে কোনোভাবেই উপলব্ধি করতে পারবে না। এমন ভয়ঙ্কর আর আতঙ্কের মধ্যেও ভালো লাগার দুটো জিনিস ছিল। একটি হলো শিশুর সান্নিধ্য আর অন্যটি হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। প্রতিদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন আর একটি সংবাদ পাব যেখানে যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয়লাভ করেছে। চুপিচুপি কানের কাছে রেডিও নিয়ে খবর শুনতাম আর উদ্দীপনামূলক গান শুনতাম। আবার যখন ঘুমাতে যেতাম নবটা ঘুরিয়ে রেডিও পাকিস্তানে এনে রাখতাম। আশপাশের দুটো বাসাকে ভয় পেতাম। একটা ছিল একজন বিহারি শিক্ষকের আরেকটি ছিল বাঙালি পরিবার। আমার স্বামীকে রাজশাহী বেতার কেন্দ্রে বক্তৃতা দেয়ার জন্য অসংখ্যবার চাপ দেয়া হয়েছে। ফোন এলেই আমি ধরতাম। কোনোবার বলতাম তিনি অসুস্থ, কোনোবার বলতাম ঘুমিয়ে আছেন। মাঝে মাঝে রেগে বলত, উনি যদি এত ঘুমান আর অসুস্থ থাকেন তবে ‘নকরি’ করেন কেমন করে? যখন খবর পেলাম যুদ্ধে আমাদের পরিবারের ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের জন্য শোক করতাম আবার এও মনে করতাম আমরা কত সৌভাগ্যবান তবুও তো বেঁচে আছি। পৃথিবীতে বিরল নয় মাসের এই স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হলো। আমরা হলাম মুক্ত, স্বাধীন। তখনো নিঃশ্বাসে কামান-মর্টারের বারুদের গন্ধ। প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশটি ধ্বংস, ছিন্নভিন্ন, বিধ্বস্ত। তবুও তো এলো কাঙ্ক্ষিত সেই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা তোমাকে সালাম। তোমাকে যেন আমরা চিরকাল ধরে রাখতে পারি।
**************************
লেখকঃ ড. ইউ এ বি রাজিয়া আকতার বানু
প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রভোস্ট শামসুননাহার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮