আজ ২৬ মার্চ। আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। আজ থেকে ৩৭ বছর আগের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের একটি শৃঙ্খলিত বাহিনীর কর্মকর্তা হয়েও দেশ, মাটি ও মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে কিভাবে সম্পৃক্ত করেছিলাম সেই বর্ণনাই স্মৃতিপট থেকে তুলে ধরছি।

১ মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পরই একটি দিকনির্দেশনা পায় এ দেশের মানুষ। সে দিনই নির্ধারিত হয়ে যায় পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন দেশ ও সত্তার জন্ম হচ্ছে। অনাচার, অবিচার, বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে পুরো বাঙালি তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঐক্যবদ্ধ। এই ভাষণটিই আমাদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে প্রভাবিত করেছিল। ৭ মার্চের পরই মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এই অঞ্চলের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হতো। আমি শৃঙ্খলিত বাহিনীর হলেও বাইরের পরিস্থিতিও খুব সহজভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম। আমার বয়স তখন ২৫। সেনাবাহিনীতে তরুণ ক্যাপ্টেন। পোস্টিং চট্টগ্রাম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে। বিয়ে করছি মাত্র কয়েক মাস। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বাসা না পাওয়ায় থাকতাম শেরশাহ কলোনির একটি সরকারি ভাড়া করা বাড়িতে। ২৫ মার্চ দিনের বেলা অফিসে বসে আমরা বাঙালি অফিসাররা নানা জল্পনা-কল্পনা ও ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে কাটাই। কী হবে, কী হতে যাচ্ছে এ নিয়ে সবার মধ্যে একটা অবিশ্বাস ও আতঙ্কের ভাব। এ রকম থমথমে অবস্থার মধ্যেও সে দিন রাত আটটার দিকে আবার ক্যান্টনমেন্টে গেলাম। চার দিকের পরিস্থিতির জন্য মন ছটফট করছিল। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উদ্বেগ কেবল বেড়েই যাচ্ছিল। সেই সাথে বেড়ে যাচ্ছিল কৌতূহলও। একপর্যায়ে মেজর বেগের (পাঞ্জাবি অফিসার) অফিসে গেলাম। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে তার সাথে কিছু কথাবার্তা হলো। এ রকম সময়েই সেখানে প্রবেশ করেন লে. কর্নেল ওসমানী (পাঞ্জাবি অফিসার)। ঢুকেই তিনি দু’শ’ রিক্রুটকে বিনা রাইফেলে টহলদানের জন্য দু’জন সুবেদারকে নির্দেশ দেন। একজন সুবেদার অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার রাইফেল ছাড়া টহল দেয়া কী করে সম্ভব? জনসাধারণের সাথে যেকোনো সময় সংঘর্ষ বেধে যেতে পারে। উত্তরে রাইফেল নিয়ে টহল দিলে জনসাধারণের মনে অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে­ এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে লে. কর্নেল ওসমানী বেরিয়ে গেলেন। আমরা চুপচাপ বসে রইলাম।

রাত ৯টা। মনে নানা জিজ্ঞাসা নিয়ে বাসায় ফিরছি। সারাদিনের ঘটনা ও আলাপ-আলোচনা কেবলই মাথায় এসে ভিড় করতে লাগল। তিনি জানালেন, সন্ধ্যা সাতটায় আমাদের জওয়ানদের সব রাইফেল অস্ত্রাগারে জমা নেয়া হয়েছে। এ তথ্য জানিয়ে নিতান্ত অসহায়ের মতো সুবেদার প্রশ্ন করল, স্যার আমাদের ইন্টারন্যাল সিকিউরিটি ডিউটি কি শেষ হয়ে গেল? আমাদের কি আর অস্ত্রের প্রয়োজন নেই? (উল্লেখ্য, রাইফেলের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। যা ছিল তাও মান্ধাতা আমলের ৩০৩। সে সময়ে সাধারণত ট্রেনিং ইনস্টিটিউশনগুলোতে এ ধরনের অস্ত্রই ব্যবহৃত হতো।) একটা গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস পেলেও আমাদের জওয়ানদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে বললাম, অর্ডারমাফিক কাজ তো করতেই হবে। মুখে এ কথা বললেও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম এর মূলে নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র আছে। তা আঁচ করতে পেরেও আমি ব্যাপারটিকে তেমন গুরুত্ব দিতে পারিনি।

এর পেছনেও কারণ ছিল। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার নিরিখে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার মান ছিল অত্যন্ত উঁচু। সেই সেনাবাহিনীর অফিসার হয়ে শৃঙ্খলার বাইরে কিছু চিন্তাই করা যায় না। সেনাবাহিনীর অফিসার বৈধ আদেশ মেনে চলবে এটাই স্বাভাবিক। এর ব্যতিক্রমই অস্বাভাবিক। ধরুন, আমরা সেই অস্বাভাবিক অবস্থায় একটা কিছু করলাম এবং তা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে গেল, তাহলে যারা এতে অংশ নিলেন, মিলিটারি বিচার অনুযায়ী তাদের ভাগ্যে কী জুটত? ইতিহাসে বিদ্রোহ করার অপরাধে সামরিক বাহিনীর লোকদের ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে যেতে হয়েছে বহুবার। তা ছাড়া আমরা যখন একসাথে চাকরি করতাম, তখন স্বাভাবিকভাবেই একে অন্যের সাথে ভাইয়ের মতো আচরণ করতাম। ভাই হয়ে কেউ কখনো ভাইকে হত্যা করতে পারে­ সে চিন্তাও মাথায় আসেনি। সেই বিশ্বাসটুকু আঁকড়ে ধরে সে রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ২৫ মার্চ রাত ১টা। ২০ নম্বর বেলুচ রেজিমেন্টের ছয় ট্রাক সৈন্য প্রথমেই আঘাত হানে রেজিমেন্টাল সেন্টারের অস্ত্রাগারে। সেখানে প্রহরারত বাঙালি সৈনিকদের হত্যা করে ছুটে যায় রিক্রুট ব্যারাকের দিকে। তারপর রিক্রুট ব্যারাক ঘিরে পজিশন নিয়ে শুরু করে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। রিক্রুট ব্যারাকে প্রতিটি কক্ষ ঝাঁঝরা করে দেয়া হলো বুলেটে। ঘুম ভাঙার আগেই মৃত্যুবরণ করল অধিকাংশ বাঙালি সৈনিক। রেজিমেন্টাল সেন্টারের যে পাকা গ্রাউন্ড মুখরিত হতো রিক্রুটদের পায়ের আওয়াজে, সেখানে টেনেহিঁচড়ে স্তূপ করা হলো তাদেরই ক্ষতবিক্ষত লাশ। সে রাতেই তারা হত্যা করেছিল আমাদের লে. কর্নেল এম আর চেরুরি এবং লে.

কর্নেল বিএ চৌধুরীকে। আগেই বলেছি, আমি ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকতাম। তাই তাদের এই অতর্কিত আক্রমণের খবরও জানতাম না। তাই অন্য দিনের মতো ভোরে পিটিতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় আমার ব্যাচম্যান খলিল খবর নিয়ে এলো, সে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে পারেনি। বায়েজিদ বোস্তামী রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে খবর পেয়েছে, ক্যান্টনমেন্ট এখন ২০ নম্বর বেলুচ রেজিমেন্টের দখলে।

এ অবস্থায় আমার কী করা উচিত, কী করণীয়, কিছুই কূলকিনারা করতে পারছিলাম না। এমন সময় দরজায় করাঘাত। চমকে উঠলাম। এই বুঝি পাঞ্জাবিরা এসে গেল। ভয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল খলিল। আমিও আল্লাহকে স্মরণ করতে লাগলাম। যেকোনো মুহূর্তে ওরা দরজার ওপাশ থেকে গুলি করে বসতে পারে। তাই দরজা খুলে দাঁড়ালাম। দেখি আমারই অধীনস্থ একজন হাবিলদার। হাঁপাচ্ছে। তার সারা শরীর রক্তে মাখা। খুনিগুলোর পরিবর্তে তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। সে চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ওরা সব বাঙালি সৈন্যদের মেরে ফেলেছে, স্যার ক্যান্টনমেন্ট আমাদের রক্তে ভাসছে।

হাবিলদারের বিবরণ শুনে সেই মুহূর্তেই মনে মনে ঠিক করলাম, এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার আগে অন্য বাঙালি অফিসারদের সাথে যোগাযোগ করা সমীচীন মনে করলাম। পাশের বাসা থেকে ৮ নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে টেলিফোন করলাম। উদ্দেশ্য ছিল মেজর জিয়াউর রহমানের (পরে রাষ্ট্রপতি) সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করা। কিন্তু মেজর জিয়াকে পেলাম না। ৮ নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সৈনিক জানাল, মেজর জিয়া সেখানে নেই। মনে তখন প্রতিশোধের আগুন। সময় খুব কম। পাকিস্তানি সৈন্যরা হয়তো আমাকে বন্দী করার জন্য এগিয়ে আসছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, এ স্থান তোমার-আমার জন্য আদৌ নিরাপদ নয়। তুমি আপাতত কোনো বাঙালির বাসায় গিয়ে লুকিয়ে থাক। তারপর সুযোগমতো নিরাপদ স্থানে চলে যেও। আমি আসি। আমার স্ত্রী কিছু না বলে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। আমি আবেগজড়িত কণ্ঠে বললাম, আমাদের এ দেখাই হয়তো শেষ দেখা। আমি সন্ধ্যার মধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করব। আমার কণ্ঠ যদি তুমি আর সরাসরি নাও শুনতে পাও, তবে এতটুকু আশ্বাস দিতে পারি যদি বেঁচে থাকি তাহলে তুমিই অবশ্যই আমার সংবাদ পাবে। সে বলল, তুমি সফল হও এই দোয়াই করি। তার কথা শেষ হতেই ‘খোদা হাফেজ’ বলে আমি ও খলিল ৮ নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্দেশে বের হয়ে পড়লাম সাদা পোশাকে।

সময় তখন ছয়টা। যানবাহনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই হেঁটে রওনা হলাম। মনে দারুণ আশঙ্কা এবং উদ্বেগ। প্রায় সাতটার দিকে আমরা ষোলশহরের ৮ নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে গিয়ে পৌঁছলাম। ওই রেজিমেন্টের প্রায় সবই ছিল বাঙালি সৈনিক। তাই বুকভরা আশা ছিল। কিন্তু কারো সাথেই দেখা হলো না। এরকম সঙ্কটময় মুহূর্তে কী করা যায়­ কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু কথায় আছে­ ‘ডুবন্ত মানুষ শেষ চেষ্টা হিসেবে খড়কুটো ধরে রক্ষা পেতে চায়’, আমাদেরও তখন সেই অবস্থা। সে রকম শেষ চেষ্টা হিসেবে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারের সাহায্য নেয়ার কথা মনে পড়ল। হেঁটে প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে পুলিশ সুপারের অফিসে গিয়ে পৌঁছলাম। তাকে অফিসেই পাওয়া গেল। বললাম, পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিয়েছে। আমাকে আপনি পুলিশ বাহিনী দিয়ে সাহায্য করুন। ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া, পুলিশ সুপার অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, শুধু পুলিশ দিয়ে আপনি কী করবেন? পুলিশ বাহিনী দিয়ে কি ক্যান্টনমেন্ট উদ্ধার করা সম্ভব? তা ছাড়া আমি এভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারছি না। আপনি বরং এ ব্যাপারে ডিআইজি’র সাথে আলাপ করতে পারেন।

পুলিশ সুপারের কথায় আমি আশা ছাড়লাম না। পাশেই ডিআইজি’র অফিস। তার সাথেও দেখা করলাম। আমার কথা শুনে ডিআইজি বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, এতবড় বাহিনীর সাথে আপনি কি পেরে উঠবেন? পুলিশ সুপার এবং ডিআইজি’র কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে অগত্যা আমি ডিসিকেই টেলিফোন করলাম। ফোনে অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর অবশেষে তিনি সাহায্য করতে সম্মত হলেন। আমাকে সাহায্য করার জন্য তিনি পুলিশ সুপারকে বলে দিলেন।

পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলার সময় নায়েক সুবেদার মফিজের টেলিফোন পেলাম। তিনি জানালেন, ৭০ জন সৈনিকসহ তিনি পাহাড়তলি পুলিশ রিজার্ভ ক্যাম্পে আছেন। তবে এদের অনেকের কাছেই কোনো হাতিয়ার নেই। সকাল দশটার দিকে পুলিশ সুপারের কাছ থেকে ৫০টি রাইফেল এবং ১ হাজার রাউন্ড গুলি নিয়ে বেলা ১১টায় পৌঁছলাম পাহাড়তলি পুলিশ ফাঁড়িতে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ৭০ জন সৈন্য এবং ১ হাজার রাউন্ড গুলি ছিল নেহাতই সামান্য। তাই আরো সৈন্য সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। যেভাবেই হোক সন্ধ্যার আগে ক্যান্টনমেন্ট পুনরুদ্ধার করতে হবে। তাই সবাইকে সেখানে রেখে আমি হালিশহর ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে গেলাম। সেখানে যাওয়ার পথে শুনলাম, কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের দিকে পাকিস্তানিদের একটি ব্যাটালিয়ন এগিয়ে আসছে। ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে অ্যামুনেশন নিয়ে আবার ফিরে এলাম পাহাড়তলির পুলিশ রিজার্ভ ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে আবার ইপিআর প্লাটুনকে পাওয়া গেল। ইতোমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেল, কুমিল্লা থেকে ২৪ নম্বর ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট চট্টগ্রামের দিকে আসছে।

ইচ্ছা ছিল সন্ধ্যার আগেই ক্যান্টনমেন্ট দখল করব। কিন্তু শত্রুর শক্তি বৃদ্ধির জন্য কুমিল্লা থেকে যে ২৪ নম্বর এফএ রেজিমেন্ট এগিয়ে আসছে, তাকে প্রতিরোধ করাই তখন প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল।

তখন বিকাল ৫টা, বেঙ্গল রেজিমেন্ট আর ইপিআর’র ১০২ জন যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত সেনাদল নিয়ে অভিযানে বের হলাম। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল একটা হেভি মেশিনগান, কয়েকটা লাইট মেশিনগান, বাকি সব রাইফেল। শত্রুর মোকাবেলায় অগ্রসর হওয়ার আগে সাধারণ সৈনিকদের উদ্দেশে বললামঃ বাঙালি ভাইয়েরা,

জাতি আরেক মহাপরীক্ষার সম্মুখীন। ইয়াহিয়া সরকারের লেলিয়ে দেয়া পশ্চিমা সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে আমাদের ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিয়েছে। তারা আমাদের সৈন্যদের মেরে ফেলেছে। এ এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এত দিন আমরা তাদের ভাই বলে মনে করছিলাম। কিন্তু তারা আজ আমাদের বুকে আঘাত হেনে সেই বিশ্বাসকে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছে। আজ থেকে আমরা আর বিশ্বাসঘাতক ইয়াহিয়া সরকারের অধীন কর্মচারী নই। আজ আমরা স্বাধীন। বাংলার অন্য জায়গায় কী ঘটছে আমরা তা জানি না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যেসব বাঙালি পশ্চিমাদের হাত থেকে বেঁচে থাকবে, তারা অবশ্যই তাদের দাসে পরিণত করবে। আমাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাবে। ধনসম্পদ লুট করবে। বাড়িঘর, গ্রাম, জনপদ সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে, মা-বোনদের ইজ্জত লুট করবে ইত্যাদি।

২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা। আমরা কুমিরায় পৌঁছলাম। শত্রুকে বাধা দেয়ার জন্য জায়গাটা উপযুক্ত মনে হলো। পথের ডানে পাহাড়, বামে কিছু দূরে সমুদ্র। শত্রুর ডানে এবং বামে প্রতিবন্ধকতা, তাই পাকা রাস্তা দিয়েই আসতে হবে। এলাকাটি দেখে কয়েক মিনিটের মধ্যে অ্যামবুশের পরিকল্পনা তৈরি করলাম। ১ নম্বর প্লাটুন ডানে, ২ নম্বর প্লাটুন বামে এবং ৩ নম্বর প্লাটুন আমার সাথেই রাখলাম। খুব তাড়াতাড়ি আমরা ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের মতো করে পজিশন নিলাম। গ্রামের লোকজনের সহযোগিতায় গাছের একটা বিরাট ডাল কেটে রাস্তার মাঝখানে ব্যারিকেড সৃষ্টি করলাম। শত্রুর জন্য ওঁৎ পেতে রইলাম।

সন্ধ্যা তখন সোয়া সাতটা। শত্রুবাহিনী ওখানে পৌঁছে গেল। শত্রুরা যখন ব্যারিকেড পরিষ্কার করতে ব্যস্ত, তখন আমি প্রথম ফায়ার করলাম। সাথে সাথে আমাদের ডান দিকের ভারী মেশিনগানটিও গর্জে উঠল। শুরু হলো শত্রু নিধন পালা। চারদিক থেকে বেরোল গুলি আর গুলি। ভারী মেশিনগান থেকে মাঝে মাঝে উজ্জ্বল ট্রেসার রাউন্ড বের হচ্ছে। আমাদের আকস্মিক আক্রমণে ওরা তখন হকচকিত। ওদের সামনের কাতারের অনেকেই আমাদের গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আর যারা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল, তারাও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের পেছনের সৈন্যরা এ অবস্থা সামলে নিয়ে মেশিনগান, মর্টার ও আর্টিলারি থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ শুরু করে দিলো। এভাবে চলল বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু বহু কষ্ট করেও শত্রুপক্ষ আমাদের বূøহ ভেদ করতে পারল না। তাদের সৈন্য বোঝাই তিনটি ট্রাকে আগুন ধরে গেল। প্রায় ২ ঘণ্টা প্রাণপণ লড়েও তারা শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হলো। এই যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল শাহপুর খান বখতিয়ার ও একজন লেফটেন্যান্টসহ বিভিন্ন পদের ১৫২ জন শত্রু সৈন্য নিহত হয়। আমরা শত্রুদের দু’ট্রাক অ্যামুনেশন কব্জা করি। আমাদের পক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামী ১৪ জন বীর সৈনিক শাহাদাতবরণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই কুমিরার লড়াইটি ছিল প্রথম ও মুখোমুখি মারাত্মক সংঘর্ষ। শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি। এভাবেই কেটেছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের সেই দিনটি।

এই স্মৃতি ৩৭ বছর আগের। যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা জীবনবাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সেই স্বপ্ন আজো স্বপ্নই রয়ে গেল। আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আজো আসেনি। ধনীরা ধনী হচ্ছে, গরিবরা আরো গরিব। সত্যি করে বলতে কি অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার কোনো মূল্য থাকে না। দুর্নীতির মতো রাহু আমাদের গ্রাস করেছে বিগত দিনে। দুঃশাসন, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি কুরে কুরে খেয়েছে দেশটাকে। এসব দেখে মনে খুব কষ্ট লাগে। এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? তবে আশার আলো যে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কার আনছে যা আগামী দিনে দেশ গড়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সরকারের উচিত দেশ শাসনে যেসব ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন তা দ্রুত সম্পন্ন করা। পরিশেষে বলতে চাই, সরকারের মূল লক্ষ্য যেহেতু একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দেয়া তাই সরকারের বাকি সময়টুকু নির্বাচনের লক্ষ্যে মনোনিবেশ করা উচিত।
 
**************************
অবঃ মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮