- Home
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- অগ্নিঝরা মার্চ ১৯৭১ সেই উত্তাল দিনগুলো
অগ্নিঝরা মার্চ ১৯৭১ সেই উত্তাল দিনগুলো
- By National Days
- Published 03/26/2008
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- Unrated
২৪ মার্চ ১৯৭১ সালে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকায় মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বানানো হবে এবং দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ট্রুপসকে শান্ত করার লক্ষ্যে জয়দেবপুর রাজবাড়ীতে দরবার নেয়ার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে দুই-দু’টি হেলিকপ্টার করে ১৭ জন সিনিয়র অফিসার সকাল ৯টায় চট্টগ্রামে উপস্থিত হয়। কনফারেন্সের নামে তারা ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঘিরে রাখল। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বাথরুমে যাওয়ার নাম করে বাইরে এসে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘আমাকে তারা ঢাকায় নিয়ে যেতে এসেছে যদি হুকুম তামিল না করি তাহলে তা হবে রিভোল্ট বলে তিনি বাথরুমে চলে গেলেন। ইস্টার্ন হেড কোয়ার্টার থেকে কর্নেল তাজ (জি-১ আই) টেলিফোনে বললেন যে, ক্যাপ্টেন আমীন যেন ব্রিগেডিয়ারের সাথে ঢাকায় এসে যায় তাকে আর্মি অ্যাভিয়েশনে সিলেক্ট করা হয়েছে এবং করাচিতে পাঠানো হবে। এদিকে গাড়ির চাবিগুলো মেজর বেগের কাছে জমা করার জন্য মেজর বেগ নাকি হুকুম জারি করেছেন। ধমক দেয়াতে সিভিল ড্রাইভার সিভিল জিপ গাড়িটি নিয়ে এলে তাকে নিয়ে দ্রুত রেলওয়ে কলোনিতে ডিএস মকবুল আহমেদের বাসায় গেলাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এম আর সিদ্দিকী ঢাকায় আছেন। টেলিফোনে কর্নেল ওসমানীকে না পেয়ে মেসেজ রেখে (হুকুম তামিল করে ঢাকায় ব্রিগেডিয়ার মজুমদার যাবেন কি যাবেন না) সেনানিবাসে ত্বরিত ফেরত চলে এলাম। মকবুল ভাবী বললেন, ‘কেন যাচ্ছেন?’ বললাম, ‘‘সঠিক জানি না এখন অনেক তাড়া তাই আর বসতে পারছি না। যদি মেসেজ আসে আমাকে টেলিফোনে শুধু ‘এসেছে’ এ কথা বললেই আমি মেসেজ সংগ্রহ করিয়ে নেব। পারলে আম্মা-বাবাকে খবরটা পাঠাবেন যে, আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে।’’ বলে রুহ আফজার শরবত খেয়ে চলে এলাম। ইপিআর’র ক্যাপ্টেন রফিকের কাছেও মেসেজে পাঠালাম যে, আমাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অষ্টম বেঙ্গলে মেজর জিয়াকে খবর দিলাম তিনি যেন হোল্ডিং কোম্পানিতে এসে আমাকে খবর দেন বিষয়টি জরুরি। তিনি এসেছিলেন এবং ক্যাপ্টেন এনামের মাধ্যমে খবর দিয়েছিলেন এনাম লাঞ্চের পর বলল আমীন মেজর জিয়া সকাল ১১টায় হোল্ডিং কোম্পানিতে তোমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেছেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। সকাল বেলায় শহরে যাওয়ার আগে দৌড়ে সিএমএইচ-এ অসুস্থ কর্নেল এম আর চৌধুরীর কাছে গিয়ে বললাম ‘স্যার ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে, আপনি শয্যাশায়ী হলেও তাড়াতাড়ি ইউনিফর্ম পরে থাকুন।’ তিনি বললেন, ‘দুই কোম্পানি তৈরি করে রাখো প্রয়োজনে রেইড করে হলেও ব্রিডেগিয়ার মজুমদারকে তাদের খপ্পর থেকে বের করে আনতে হবে’। পোর্টে তখন জেনারেল মিঠ্ঠা ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে (সাথে ক্যাপ্টেন মহসীন) সামনে বসিয়ে টেবিল থাপড়িয়ে বললেন, ‘আনলোড সোয়াত’।
লাঞ্চের সময় কর্নেল জানজুয়া বললেন, ‘আমীন ডিড ইউ সি মাই টুআইসি?’ উত্তরে বললাম যে, এখানে ইউনিট অধিনায়ক এবং লে. কর্নেল পদবি ও তদূর্ধ্ব পদবি অফিসারদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে। টুআইসি’র আসার কথা নয়। কর্নেল জানজুয়ার সাথে ১৯৬৭-৬৮ সালে জয়দেবপুর ও লাহোরে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে এক সাথে চাকরি করার সুবাদে যথেষ্ট হৃদ্যতা ছিল। দেখি ডিসি মোস্তাফিজুর রহমানও এসেছেন। নায়েক ক্লার্ক মিজান এবং অন্যরা মেসের বাইরে অপেক্ষা করছিল। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলছিল ‘স্যার আপনারা যাবেন না। এদের বিশ্বাস করবেন না। ট্রুপস কোত্থেকে হাতিয়ার বের করে পাহাড়ে পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে ফেলেছি। হেলিকপ্টার দু’টি মুহূর্তের মধ্যে উড়িয়ে দিতে পারবে।’ মেসে তখন সেন্টারের ব্যান্ড মিউজিক বাজছিল। বলল, ‘ব্যান্ডের সকল সৈনিক পোশাকের ভেতর লোডেড অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে হুকুম দিলে এখান থেকে একজনও জীবিত যেতে পারবে না।’ সম্বিত ফিরে যখন উপরে পাহাড়ের দিকে তাকালাম, তখন একেবারে চমকে উঠলাম। শরীর হিম হয়ে গেল প্রায়। সে সময় মেসে লাঞ্চ করার জন্য জেনারেল জানজুয়া, খোদাদাদ, খাদিম হুসেন রাজা, কমান্ডার মোমতাজ, ব্রিগেডিয়ার আনসারী বাবর যুদ্ধজাহাজের কমান্ডার আযীমসহ প্রায় ১৭ জন সিনিয়র অফিসার উপস্থিত। বস্তুত জেনারেল টিক্কা খানসহ হাতেগোনা চার-পাঁচজন সিনিয়র অফিসার বাদ দিলে ইস্টার্ন কমান্ডের সংশ্লিষ্ট কমান্ডার ও সিনিয়র অফিসাররা (চট্টগ্রামে কর্মরত সকল সিনিয়র অফিসার বাঙালি-অবাঙালিসহ) তখন আমাদের সাথে লাঞ্চ করছিলেন। ঢাকা থেকে আসা হেলিকপ্টার দু’টি প্যারেড গ্রাউন্ডে পার্ক করে আছে। অবশ্য দু’টি ট্যাঙ্ক ইবিআরসি’র মেইন রাস্তা ও প্যারেড গ্রাউন্ডের পাশে অবস্থান নিয়ে মোটামুটি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের বাড়ি ও মেসের দিকে ব্যারেল তাক করে আছে। পূর্বাহ্নে ট্যাঙ্কের বাঙালি ড্রাইভাররা ট্যাঙ্কের ইঞ্জিনের ভেতর বালি ফেলে দিলে ট্যাঙ্ক অকেজো হয়ে যাবে বলে আমাদের জানিয়েছিল। সেনানিবাসে তখন সর্বমোট তিনটি ট্যাঙ্ক ছিল ক্যাপ্টেন কেয়ানির (ইবিআরসি মেসে কেয়ানি আমার পাশের রুমেই থাকত। ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে কেয়ানি ক্যাপ্টেন এনাম আহম্মদ চৌধুরীকে তার ট্যাঙ্কে পুরে শেরশাহ কলোনি পর্যন্ত এনে ছেড়ে দিয়ে বলল ‘স্যার ভাগো’। প্রাণে বেঁচে যায় এনাম) অধীনে। কিন্তু কি করব সাংঘাতিকভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। আমাদের হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত যদি জাতির জন্য বিপদ বয়ে আনে? আবার এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। দুই কুল রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। বড় অসহায় মনে হলো নিজকে। ট্রুপস মনে করছে আমরা ভীরু-কাপুরুষ। আর ট্রুপসের প্রচণ্ড গোস্সা যে, তাদের সামনে দিয়ে তাদের কমান্ডারকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছিলাম। এক সময় দৌড়ে আবার সিএমএইচে কর্নেল চৌধুরীর কাছে গেলাম। দেখি তিনি হাতের ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।
বললেন, ‘যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?’ বললাম ‘ঢাকায় মেসেজ পাঠিয়েছি এখনো কোনো উত্তর আসেনি।’ তাকে বললাম যে, ঢাকায় পৌঁছে যদি সরাসরি এরেস্ট না হই তাহলে মি.
ঢাকায় আমাদের ব্রিগেডিয়ার জাহাঞ্জেব আরবাবের বাসায় (স্টাফ রোড বর্তমানে বাশার রোডের ৫৬ নম্বর বাড়ি, পরে এজি হিসেবে ওই বাসায় প্রায় তিন বছর ছিলাম) নিয়ে যাওয়া হলো। বাসার ভেতরে লনে টেন্ট লাগিয়ে বহু অবাঙালি বেসামরিক ব্যক্তি অবস্থান করেছিল। আমি মামার বাসায় যেতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার আরবাব বললেন, ‘বাচ্চু সিটি ইজ নট সেইফ রেদার স্টে ইউথ মি’ এর ভেতর মামা ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম চৌধুরী গাড়ি নিয়ে এলে আমি জোর করে চলে আসি। কথাবার্তায় এক পর্যায় ব্রিগেডিয়ার মজুমদার যখন বললেন, ‘আরবাব আই হোপ কান্ট্রি ডাজ নট নিড থার্ড ফ্লাগ (ব্ল্যাক, পাক ও বাংলাদেশ)। উত্তরে আরবাব বললেন, ‘গিব মি টু কোম্পানি আই ক্যান স্ট্রেইটেন আপ অ্যাভব্রি বডি ইন ক্লুডিং ইউর বঙ্গবন্ধু’ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার পরে আস্তে আস্তে আমাকে বললেন, ‘আহাম্মকরা দুই কোম্পানি দিয়ে বাংলাদেশ জয়ের স্বপ্ন দেখছে’। দুঃখ হলো পাকিস্তানি ব্রিগেড কমান্ডার কোম্পানি কমান্ডারের ওপরে উঠতে পারছিলেন না। পুরোপুরিভাবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জেনারেল নিয়াজীও কোম্পানি কমান্ডারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। সমস্যা সমাধানে গভীর কোনো চিন্তাভাবনা তাদের ছিল বলে মনে হয়নি। তারা সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে প্রচণ্ডভাবে শক্তি প্রয়োগ করে এই জটিল রাজনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান বলে মনে করছিল। তাতে করে অবাধ্য বাঙালিদের সমুচিত শাস্তি প্রদান করাও সম্ভব হবে। যুদ্ধ চলাকালীন লুট করার অপরাধে ব্রিগেডিয়ার আরবাবের কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা ছিল। পরে দেখা গেল লুটেরা আরবাব লে. জেনারেল পদে পদোন্নতি পায়।
২৪ তারিখ রাতে মেজর জিয়া ও কর্নেল চৌধুরী মকবুলের বাসা হয়ে শফির (রেলওয়ের প্ল্যানিং অফিসার। পরে শফিকে ভীষণ অত্যাচার করে পাকবাহিনী হত্যা করে) বাসা থেকে টেলিফোন করলেন। বললাম, এখনো আমাদের সরাসরি অ্যারেস্ট করেনি। কালকে বোঝা যাবে তারা যদি একান্তই অ্যাকশনে যায় তা কবে নাগাদ হতে পারে। বললাম, ক্যাপ্টেন রফিক একেবারে প্রাইম হয়ে আছে এবং যেকোনো মুহূর্তে পাঞ্জাবিদের ওপর চড়াও হতে পারেন। মনে হয় এখনই তাকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার জন্য বলা শ্রেয়। তা না হলে সবার অজান্তে তিনি একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। কর্নেল চৌধুরী তার ভক্সওয়াগন গাড়ি করে মেজর জিয়াসহ ক্যাপ্টেন রফিকের কাছে গিয়ে তাকে স্ট্যান্ড ডাউন করে ফেলেন প্রায়। পরে মনে হয়েছে যে আগ বেড়ে এই মেসেজটা দেয়া আমার জন্য সঠিক হয়নি। ক্যাপ্টেন রফিক মেজর জিয়া ও কর্নেল চৌধুরীর জ্ঞানবুদ্ধির ওপর সন্দেহ প্রকাশ করলেন। স্বাধীনতার পরপরই মেজর রফিক মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বই লিখেন (লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে)। তার বইয়ে তিনি মেজর জিয়া ও কর্নেল চৌধুরীকে সেভাবে চিত্রিত করেছেন। আবার মেজর জিয়া যুদ্ধের শুরুতে আমি আগরতলায় পৌঁছলে সন্দেহ করে আমাকে পাকিস্তানি চর ভেবে ভারতীয়দের ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মেজর জিয়া আমার প্রেরিত বার্তাটিকে একটি সুপরিকল্পিত সাবোটাজ বলে ধরে নিয়েছিলেন, তা না হলে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার যেখানে গ্রেফতার হয়ে গেলেন, সেখানে আমি কী করে ঢাকা থেকে পালিয়ে আসতে পারলাম? নিশ্চয়ই পাকিস্তানিরা আমাকে প্লান করে পাঠিয়েছে। জেনারেল জিয়াউর রহমান বহু বছর পাক গোয়েন্দা সংস্থায় চাকরি করেছিলেন (ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও কর্নেল মুস্তাফিজের অধীনে)। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলে কোনোমতে ভারতীয়দের বদান্যতায় প্রাণে বেঁচে মেজর জিয়ার অধীনেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম।
২৫ মার্চ ৮টার দিকে কর্নেল মুঈদের বাসায় ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও মামা শাহ আলম চৌধুরীসহ নাশতা খেলাম। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে যাওয়ার প্রাক্কালে আমাকে বললেন, ‘তুমি চট্টগ্রাম চলে যাও, কর্নেল চৌধুরীকে মেসেজ পাঠাও লাল ফিতা উড়িয়ে দিতে’ অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে দেয়া এটা তিনি ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে বললেন। বলেই তিনি গাড়িতে চেপে জয়দেবপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়ে দেন। কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। মামার ভক্সভল ভিভা গাড়ি গ-১৫৭ গাড়িটির বহু পুরনো ও বিশ্বস্ত ড্রাইভার আহমেদ আলীকে (আমি খেয়াল করিনি আহমেদ অবাঙালি) নিয়ে প্রথমে গিয়ে রিপোর্ট করলাম এয়ার ফোর্সের মেডিক্যাল ইউনিটে। তারা বললেন, ২৭ মার্চ রিপোর্ট করার জন্য। বললাম, এই দু’দিন কী করব উত্তরে বললেন, ‘আয়েশ করো’। ক্র্যাকডাউনের পর ট্রেঞ্চ কেটে মোটামুটি ওই গাড়িটি মাটিচাপা দিয়ে মামা তার চেয়ারম্যান পূর্ব পাকিস্তানের ভূতপূর্ব গভর্নর গোলাম ফারুকীর সহায়তায় সোজা বিলাত পাড়ি জমান। মতিঝিলের হক ম্যানসনে মামার অফিস থেকে টেলিফোনে মিসেস মকবুলকে সরাসরি বললাম, কর্নেল চৌধুরী এলে বলবেন যে লাল ফিতা উড়িয়ে দিতে তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। একটু উচ্চৈঃস্বরে বললাম, ‘আমি যা বলছি তা হুবহু লিখুন লাল ফিতা উড়িয়ে দাও’ অন্য টেবিলে কর্মরত মামা শাহ আলম চৌধুরী চমকে আমার দিকে তাকালেন। সেনানিবাসে টেলিফোনে কাউকে পেলাম না। শহরে ক্যাপ্টেন এনামের আত্মীয় জয়নাল আবেদীন সাহেবের শ্যালক শহীদকে টেলিফোন করলাম। শহীদ বলল, শহরের চতুর্দিকে জনতা ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রেখেছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে সেনানিবাসে যাওয়া যাবে না তবে সে হাজী ক্যাম্পের সাইডের রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের গায়ে গায়ে তার ভেসপাটি চালিয়ে নতুনপাড়ার (কাঁচা রাস্তা) আশপাশে আমাকে পৌঁছাতে পারবে বলে বলল। বললাম, রওনা দেয়ার আগে আবার টেলিফোনে মেসেজ পাঠাব। আবার সেনানিবাসে টেলিফোন করে প্রথমে ক্যাপ্টেন মহসীনকে পেলাম। তিনি টেলিফোন কর্নেল চৌধুরীকে দিলেন। কর্নেল চৌধুরী বললেন, ষোলশহরে ট্রেনের বগি দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে জনতা সেনানিবাসের সাথে শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এমনকি গত রাতে তিনি তার ভক্সওয়াগন গাড়িটি রেখে পায় হেঁটে সেনানিবাসে ফেরত আসেন। বললাম বস বলছেন, লাল ফিতা উড়িয়ে দিতে। তিনি উত্তরে বললেন, এ ধরনের কার্যক্রমের (লাল ফিতা শেষ করে দেয়া) জন্য বস নিজে সরাসরি বললে ভালো হয়। বললাম, বিকেলের ভেতর তাকে দিয়ে বলানো যাবে। তারপর গেলাম কর্নেল ওসমানীর কাছে ধানমন্ডিতে লেকের পাড়ে সম্ভবত ৭ নম্বর রোডের ৬০ নম্বরের এক বাড়িতে। বললাম, গাড়ি নিয়ে এসেছি এখনি চট্টগ্রামে শিফট করতে হবে। তিনি পরে নিচে অনেক ছোটাছুটি করলেন। বললেন, ইয়াহিয়া খান একটা অ্যানাউন্সমেন্ট করবে আজ রাত ৮টার মধ্যে অথবা কাল দুপুর ১টার মধ্যে। তখন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটের মতো বাজে। বললেন, একটু ধৈর্য ধরতে সঠিক মনোভাবটা জানার পরই এ ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কী করব বুঝে উঠতে পারলাম না। বিক্ষুব্ধ মন নিয়ে সোজা গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আ স ম আবদুর রব এবং অন্যরা ছিলেন। বললাম, ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে কেন ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে কেন অগণিত মানুষের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে সোয়াত আনলোড করার জন্য পাক আর্মি মরিয়া হয়ে উঠেছে তাহলে বৈঠকের ফলাফল কী হলো? ইত্যাদি। একটি ইমার্জেন্সি বুলেটিন নাকি তারা বিকেলের ভেতর বের করেছিলেন।
বিকেল ৪টার দিকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের সাথে ধানমন্ডিতে তার বড় ভাইয়ের বাড়িতে দেখা করি। আমি কেন চট্টগ্রাম যাইনি ব্রিগেডিয়ার মজুমদার সে জন্য ভীষণ রাগ করলেন। বললাম, কর্নেল ওসমানীর সাথে দেখা করেছি গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম তাকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যাব। তিনি ধৈর্য ধরতে বললেন। তাই এখন পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের অপেক্ষা করে আছি পরবর্তী আদেশের জন্য। আরো বললাম, আমি এখন চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দিতে পারি। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বললেন সন্ধ্যায় কর্নেল মুঈদের বাসায় যেতে। সেখান থেকে কর্নেল চৌধুরীর সাথে তিনি কথা বলবেন। কর্নেল মুঈদের বাসা থেকে তিনি তার স্ত্রীর সাথে কথা বলতে পারলেও কর্নেল চৌধুরীর নাম্বার (থ্রিথ্রি) চাইলে বলা হলো লাইন ডাউন। রাত ৯টার দিকে সেনানিবাস ছেড়ে শহরের দিকে যেতে চাইলে ড্রাইভার আহম্মদ বলল, ‘সাব, সামনে রাস্তার পর পাবলিক নে ব্যারিকেট দে রাহা হ্যায়। সাব আজ রাত ম্যায় শহর ম্যায় বহুত গড়বড় হো সেকতা ঘর অপাস চলে’ বলে গাড়ি ঘুরিয়ে গুলশানে মামার বাসায় পৌঁছিয়ে দেয়। সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার সময় মনে হলো সেনানিবাসের রাস্তাঘাট বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল।
**************************
লেখকঃ আমীন আহম্মেদ চৌধুরী বীর বিক্রম
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত।
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮