National Events - http://events.amardesh.com
মুক্তিযুদ্ধ ও দায়বদ্ধতা
http://events.amardesh.com/articles/114/1/aaaaaaaaaaa-a-aaaaaaaaa/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 03/26/2008
 

বাঙালি/বাংলাদেশীরা স্বভাবতই একটু বেশি আবেগপ্রবণ। এটা তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই প্রতীয়মান হয়। ভালো কাজের উদ্দীপনায়, আনুষ্ঠানিক পালাপার্বণে, সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়েও এটা দৃশ্যমান। বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটের আলোকে এটা প্রতিফলিত হয়েছে যেমন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঘটনায় বাঙালির আত্মদান, বিশেষ করে ‘মুখের ভাষা কেড়ে নেবার’ প্রতিবাদে যে সোচ্চার ভূমিকা সেদিনের জনসাধারণ বিশেষ করে ছাত্রসমাজের, তা ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃত একটি মাইলফলক। এখনো ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান হয়, আর বাংলা একাডেমীর বইমেলা যেন একটি আবশ্যিক করণীয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।


মুক্তিযুদ্ধ ও দায়বদ্ধতা

বাঙালি/বাংলাদেশীরা স্বভাবতই একটু বেশি আবেগপ্রবণ। এটা তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই প্রতীয়মান হয়। ভালো কাজের উদ্দীপনায়, আনুষ্ঠানিক পালাপার্বণে, সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়েও এটা দৃশ্যমান। বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটের আলোকে এটা প্রতিফলিত হয়েছে যেমন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঘটনায় বাঙালির আত্মদান, বিশেষ করে ‘মুখের ভাষা কেড়ে নেবার’ প্রতিবাদে যে সোচ্চার ভূমিকা সেদিনের জনসাধারণ বিশেষ করে ছাত্রসমাজের, তা ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃত একটি মাইলফলক। এখনো ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান হয়, আর বাংলা একাডেমীর বইমেলা যেন একটি আবশ্যিক করণীয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।

ফেব্রুয়ারির পরই মার্চ মাস,স্বাধীনতা আন্দোলনের মাস­ ১ থেকে ২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে নানাবিধ স্মরণীয় ঘটনা যেমন­ পতাকা উত্তোলনের দিন, স্বাধীনতার সনদ উপস্থাপনের দিন, অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়ার দিন সবই স্মৃতিতে ভাস্বর। তবে সবচেয়ে বেশি মর্মন্তুদ হচ্ছে ২৫ মার্চ, যাকে বলা হয় ‘কালরাত্রি’ আর এ দিনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা। যা আবালবৃদ্ধবনিতার কেউই ভুলতে পারে না। একটু পেছনের দিকে দেখলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২, তারপর নানা ঘটনায় বঞ্চনার ইতিহাস আসলে এর ইন্ধন। পশ্চিম পাকিস্তানের কুচক্রীদের মুরব্বিপনায় যখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শোষিত হচ্ছে তখন ১৯৭০ সালে প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোনে আমাদের অসহায়ত্বের দাগ কেটে যায় সবার মনে­ আর তাই বছরের শেষে নির্বাচনের ৩০০ আসনের ১৬৭টি পায় আওয়ামী লীগ। স্বভাবতই বাংলাভাষীরা আশা করছিল যথাশিগগির ক্ষমতার হস্তান্তর কিন্তু তদানীন্তন সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খানকে দিয়ে অন্যায়ভাবে জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করার পর আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের জন্য শেখ মুজিবের কাছে পাঠানো হয়। পরে ভুট্টো যোগ দেন ঢাকায়। অন্য দিকে জেনারেল হামিদ পীরজাদা, গুল হাসান মিঠ্‌ঠা গংদের চক্রান্তের গোপনীয়তা রক্ষা করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্যসামন্ত গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামাদি আনার ব্যবস্থা করে।

আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে বলে রাতের আঁধারে ঢাকা ছাড়ে। এর পরই শুরু হয় নীলনকশার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামীয় দানবীয় ঘটনার অভিযান। এখানে অবস্থিত গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল আহসান ও জিওসি সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে প্রত্যাহার করে জেনারেল টিক্কা খান ও মেজর জেনারেল খাদিম রাজাদের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই সাথে বেসামরিক পরামর্শদাতা মেজর রাও ফরমান আলী সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সাথে সাথে গোটা শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক আলোচনা ভণ্ডুল করে দিয়ে পশ্চিমারা আমাদের ন্যায্য অধিকার হরণ করে ভিন্ন কায়দায় আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ জানতেন না এত শিগগিরই ঢাকা শহরে অকল্পনীয় নারকীয় অভিযান নেমে আসবে দানবীয় ছোবল নিয়ে। পরিকল্পনার সার্থক রূপায়ণের জন্য রাওয়ালপিন্ডি থেকে নির্দেশ অনুযায়ী ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টার্সের ১৪ পদাতিক ডিভিশন সাথে ৫৭ ফিল্ড রেজিমেন্টের সাপোর্ট বাহিনী নিয়ে মধ্যরাতে মাঠে নামে। ধূর্ততা, গতি, সামারিক শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার, নির্বিচারে গণহত্যা, অ্যারেস্ট, সার্চ, ধর্ষণ, খুন, লুটপাট ও সবরকম অমানুষিক প্রক্রিয়ায় মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে সকাল ৬টার মধ্যে পুরো শহর নিয়ন্ত্রণে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। আর এর ফলাফল যা-ই হোক, যথাশিগগির গোটা শহর বিশেষ করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানায় বিডিআর হেডকোর্য়াটার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিপজ্জনক অবস্থান মনে করে আক্রমণের তীব্রতা বাড়াতে হবে। রাজারবাগে তখন প্রায় ২০০০ পুলিশ, পিলখানায় ২৫০০ বিডিআর আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের মধ্যে বিশেষ করে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্রদের ওপর নেমে আসে খঢ়গ। বিনা দোষে অনেকে প্রাণ হারায়, আহত হয়, বন্দী হয় এবং সরে যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। রাজারবাগের সিপাহিদের সাথে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা মিলে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমরা স্তম্ভিত হই অকুতোভয় সেই সিপাহিদের স্মরণ করে স্বাধীনতার বীজ বপনের মুহূর্তে তাদের অবদানের অনবদ্য ভূমিকার জন্য, যা অতুলনীয় হয়ে থাকবে ইতিহাসে।

দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কী হয়েছে ঢাকা শহরে জানার জন্য কিন্তু কারফিউ, রেডিও, টিভি নিয়ন্ত্রিত, সংবাদপত্র প্রকাশে বিড়ম্বনা, সব মিলিয়ে সবাই অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন আসল ঘটনা জানতে। ঢাকা শহর তথাকথিত নিয়ন্ত্রণের পর বিভিন্ন জায়গায় একই রকমভাবে অভিযান চালানো শুরু হয়­ তার মধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোর, কুমিল্লা, সৈয়দপুর, রংপুর, সিলেট প্রধান টার্গেট ছিল। এ কাহিনী বিস্তৃত না করে বলব, সেই মধ্যরাতের দুঃসহ ঘটনাই পরে দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধেও মূল ‘স্বপ্ন’ হিসেবে ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে আমি না বলে পারছি না যে তদানীন্তন পাকিস্তানের সুপিরিয়র সার্ভিস বিধান অনুযায়ী আমি দু’বছর পশ্চিম পাকিস্তানে চাকরি শেষে রাওয়ালপিন্ডির এসপি’র দায়িত্ব পালন করে পূর্ববঙ্গে যশোর জেলার এসপি হিসেবে ৭১’-এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে যোগদান করি। তখনকার যৌবন বয়সে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের চাকরির পার্থক্য ও বিশেষ করে পাঞ্জাবি অফিসারদের অমানসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে একাত্মতা বোধ করি। তাই ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়িয়ে থেকে পুলিশলাইনে অস্ত্র অগণিত স্বেচ্ছাসেবী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিতরণ করি। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্ত্রী, দুই বছরের কন্যা ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাইকে রেখে আমাকে বন্দী করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিক্রিয়ার ধরন যে কত কঠিন হতে পারে তা বুঝতে পারি যখন ৫৫ বেলুচ রেজিমেন্টের এফআইইউ’র হেফাজতে ১৭ দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমাকে। প্রতিদিন দিনে ও রাতে দু’বার মৃত্যুর কাছাকাছি গেছি, শুধু আরো ভোগান্তির অপেক্ষায়। নিশ্চিতভাবে এখন ভাবি ও বলি, আমার চরম শত্রুকেও যেন এ ধরনের অবস্থার শিকার না হতে হয় কোনোভাবে।

আমরা ১৬ ডিসেম্বর দিবস পালন করি সবাই উৎফুল্লভাবে। আমরা কি আবারো নতুন করে ভাবব ‘৭১ এ যারা জীবন দিয়ে আমাদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার পথ করে দিয়েছেন, আর আমরা লাল-সবুজ পতাকার স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছি, তাদের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সবার কাছে এ বিনীত অনুরোধ, আমরা আর যা-ই করি ইতিহাস যেন বিকৃত না হয়­ ‘তাই গৃহযুদ্ধ নয় মুক্তিযুদ্ধই’ আমাদের আরাধ্য স্বাধীনতা দিয়েছে। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আমাদের ও পূর্বসূরিদের স্মরণ করে এ দেশের গোড়াপত্তনের ইতিহাস সৃষ্টির জন্য যার সূচনা হয়েছিল সেই ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ভয়াল ঘটনার মাধ্যমে, আমরা যেন তা থেকে বিস্মৃত না হই এবং আজীবন কৃতজ্ঞতা বোধ করি।

**************************
লেখকঃ   ড. এম এনামুল হক
সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮