- Home
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- গণতন্ত্রঃ স্থান কাল পাত্র
গণতন্ত্রঃ স্থান কাল পাত্র
- By National Days
- Published 03/26/2008
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- Unrated
স্থান নিউইয়র্ক; কালঃ ১৯৮৩;
পাত্রঃ জর্জ অরওয়েলঃ উপন্যাসঃ ১৯৮৪।
‘আর মাত্র এক বছর বাকী।’ নিউইয়র্কের একটি বুকস্টল। সেই বুকস্টলের সামনে আগুনে অক্ষরে খোদাই করা একটি পুস্তকের বিজ্ঞাপনঃ ‘আর মাত্র এক বছর বাকী।’ ... পুস্তকের নাম ‘১৯৮৪।’ লেখক জর্জ অরওয়েল। পুস্তকটি জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন ১৯৪৯ সালে। সুবিখ্যাত ‘এনিম্যাল ফার্মের’ সেই তুখোড় লেখক বহু আগেই কল্পনা করছিলেন ১৯৮৪ সালের দিকে এমন একটা সময় আসবে, এমন একটি দেশ প্রতিষ্ঠিত হবে যার শাসক হবেন বিগ-ব্রাদার। সেই বিগ-ব্রাদারের নখদর্পণে থাকবে দেশের সব কিছু। সে দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হবে সেই বিগ-ব্রাদারের হাতে। দেশের সব মানুষই হবে সেই ‘ওসানিয়া’ নামক দেশের একক পার্টির সদস্য। সর্বহারারা সে দেশে থাকতে পারবে বটে; কিন্তু তাদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
‘১৯৮৪’ নামক পুস্তকে জর্জ অরওয়েল লিখেছেনঃ ‘ওসানিয়া’ নামক সেই দেশের মোড়ে মোড়ে গোঁফওয়ালা এক বিরাট মুখের প্রতিকৃতি টাঙানো রয়েছে এবং তার নিচে লেখা আছেঃ ‘আপনার সব কিছুই বিগ-ব্রাদার লক্ষ করছেন।’
জর্জ অরওয়েল যখন পুস্তকটি প্রকাশ করেন, তখন চার দিকে হইচই পড়ে গিয়েছিল। যারা তখন স্বাধীন গণতান্ত্রিক বিশ্বের কথা চিন্তা করতেন, তারা ধরে নিয়েছিলেন যে, জর্জ অরওয়েল তাদের সপক্ষেই পুস্তকটি রচনা করেছেন। তারা পুস্তকটিকে অভিহিত করতেন ‘এ ওয়াচ ওয়ার্ড ফর গার্ডিয়ান্স অব লিবার্টি বলে। তারা আরো বলতেন ১৯৮৪ হচ্ছে এ বিলিং মেটাফর অব অপ্রেশন অব দ্য ইনডিভিজুয়াল বাই দ্য স্টেট।’
মজার কথা এই যে, জর্জ অরওয়েলের এই সাড়াজাগানো পুস্তক ‘১৯৮৪’ সেকালের পাশ্চাত্যের বামপন্থী মহলেও তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তারা বলতেন, পুস্তকটি আসলে ফ্যাসিবাদী স্বৈরতার বিপক্ষে এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। এ দিকে তখন সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলছিল পাশ্চাত্যের স্নায়ুযুদ্ধ। এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের প্রবক্তারা ভাবতেন, ‘১৯৮৪’ পুস্তকটি আসলে সোভিয়েত কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে একটা মোক্ষম আঘাত।
উল্লেখ যে, জর্জ অরওয়েল ছিলেন ব্রিটেনের লোক। সমাজবাদী চিন্তাধরার অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন তিনি। অথচ টোরি তার ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটিকে সমাজবাদী লেবার পার্টির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধা করেননিই। টোরি দলের অভিমত, যেহেতু সমাজবাদী রাষ্ট্রমাত্রই পুলিশি-রাষ্ট্র হতে বাধ্য, সেহেতু জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের নায়ক উইন্সটন এবং নায়িকা জুলিয়া হচ্ছেন সেই একনায়কত্ববাদী পুলিশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত প্রতিবাদ।
সেকালের মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল নিজে এই পুস্তকের সমালোচনা লিখেছিলেন। বলেছিলেন, যেকোনো ধরনের ডিক্টেটরিয়াল শাসনব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতির কথাই এই লেখক তার সুনিপুণ লেখনী ক্ষমতা, অপরিমেয় দক্ষতা এবং কালজয়ী কল্পনাশক্তির দ্বারা আলোচনা করেছেন।
২.
একদা ফ্যান্টাসি-জগতের ফরাসি লেখক জুলেভার্নে যে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার চোখ দিয়ে তার বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাসগুলো রচনা করেছিলেন, সময় তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। হাক্সলির সাড়া জাগানো ‘টাইম মেশিনের’ জগতও এখন আর বিশ্ববাসীর অগোচরে নেই। দ্য ভিঞ্চি তাঁর শৈল্পিক প্রতিভার তুলিতে এঁকেছিলেন অ্যারোপ্লেনসহ বহু আধুনিক যানবাহনের আগাম নকশা। আর জর্জ অরওয়েল? কালজয়ী লেখনীর দ্বারা সেই পঞ্চাশ দশকের শুরুতেই তিনি এঁকেছিলেন এমন এক জগতের ছবি যে জগতে বিগ-ব্রাদার নামক শাসক দেশের সব মানুষের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখেন। অত্যাচার ও নির্যাতনের দ্বারা দেশের মানুষকে বলতে বাধ্য করেনঃ ‘দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ হয়।’
আজ যখন মহাশূন্যে বিভিন্ন শক্তির কৃত্রিম উপগ্রহের ঘোরা-ফেরার কথা শুনি, শক্তিশালী দুরবিন, অ্যান্টেনা আর টিভি পর্দায় দূরকে নিকট করার খবর; এমনকি পর্দার অন্তরালের সব রহস্য ফাঁস হওয়ার কীর্তিকাহিনী শুনি, সেই সাথে শুনি বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকদের দুঃশাসনের ইতিবৃত্ত; ভেবে পাই না, ‘জর্জ অরওয়েল শুধু কি সমাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, নাকি সবধরনের স্বৈরতার বিরুদ্ধেই তার ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল এক সোচ্চার প্রতিবাদ হিসেবে?
‘১৯৮৪’ উপন্যাসটির নায়ক হচ্ছেন উইন্সটন এবং নায়িকা জুলিয়া। তাঁরা দু’জনই ছিলেন বিগ-ব্রাদার শাসিত ‘ওসানিয়া’ নামক একদলীয় রাষ্ট্রের একক পার্টির সদস্য ও সদস্যা। উইন্সটন কাজ করতেন ‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ’-এ; আর জুলিয়া কাজ করতেন মিনিস্ট্রির ‘উপন্যাস বিভাগে।’ ‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথের’ সুবিশাল দালানের গায়ে ঝকঝকে অক্ষরে লেখা ছিল পার্টির এই ত্রয়ী ্লোগান ‘যুদ্ধই শান্তি’, ‘স্বাধীনতাই দাসত্ব’ এবং ‘অজ্ঞতাই শক্তি।’
এদিকে গোটা দেশের সব বাড়িতে, সব অফিসে, সব আদালতেই বসানো রয়েছে একটা করে যন্ত্র। সে যন্ত্র সব সময়ই বিগ-ব্রাদারের গুণগানে মুখর। কখনো-সখনো উন্নয়ন পরিকল্পনার জয়গানে উদ্বেল। (কমিউনিস্ট বিশ্বের কিংবা তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরশাসিত কোনো দেশের রেডিও টিভি’র ভূমিকা স্মর্তব্য) এটা এমন একটা যন্ত্র, যে যন্ত্র শুধু কথা শোনায় না; বাইরের সব কথা সব শব্দ গ্রহণও করে। ফিসফিসানি শব্দ পর্যন্ত এই যন্ত্র ধরে ফেলে এবং যে বা যারা ফিস ফিস করে কথা বলছে, তাদের ছবিসহ তৎক্ষণাৎ এই যন্ত্র তা প্রেরণ করে দেয় ‘চিন্তা-পুলিশের’ দফতরে। সে দেশের সব লোকই ক্ষমতাসীন পার্টির সদস্য এবং পার্টি মেম্বারদের সব সময়ই একই ধরনের চিন্তাভাবনা করতে হয়। একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কি ওই যন্ত্রে সেই বাঁকা চিন্তা পর্যন্ত ধরা পড়ে এবং চিন্তা-অপরাধ নামক গুরুতর অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হতে হয়।
‘ওসানিয়া’ রাষ্ট্রে প্রতিদিন ভোর হয় একটা তীক্ষ্ন নারী কণ্ঠের চিৎকারে। প্রতিদিন ভোরে বলতে গেলে প্রায় অদৃশ্য থেকেই সেই নারী কণ্ঠ চিৎকার করে গোটা দেশের গ্রুপ-কে গ্রুপ মানুষকে ‘শারীরিক ব্যায়াম অনুশীলনের’ জন্য ডাক দেয়। কেউ চোখের সামনে নাই; তবুও দরজা-বন্ধ একা ঘরে ব্যায়ামের জন্য অ্যাটেনশনে দাঁড়াতে গিয়ে একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কি, সেই অদৃশ্য নারী কণ্ঠ কর্কশস্বরে চেঁচিয়ে উঠবেঃ ‘স্মিথ! স্মিথ উইন্সটন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি! সিক্স জিরো সেভেন নাইন! দয়া করে আর একটু বাঁকা হোন। হ্যাঁ, আরো একটু।’ রচনার এই পর্যায়ে অরওয়েল লিখেছেনঃ ‘ভয়ে ত্রাসে স্মিথ উইন্সটনের সারা দেহে ঘাম ঝরতে থাকে। অথচ চেহারায় তার কোনো প্রকাশ ফুটতে দেয়া যাবে না। এমন ভাব কখনো প্রকাশ করা চলবে না যে, আপনি ভয় পেয়েছেন; কিংবা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। চোখের পলক এদিক থেকে ওদিক হয়েছে কি, আপনি বিগ-ব্রাদারের টিভি পর্দায় ধরা পড়ে যাবেন।’
৩.
‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ’-এ উইন্সটনের কাজ ছিল ‘সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বানানো।’ হয়ত কিছু কাল আগে বিগ-ব্রাদার তার এক ভাষণে বসেছিলেন, ‘অমুক দেশটি অমুক দেশ আক্রমণ করবে।’ কিন্তু সময়ে দেখা গেল, আক্রান্ত হয়েছে অন্য একটি দেশ ভিন্ন একটি দেশের দ্বারা। উইন্সটনের কাজ হচ্ছে, বিগ-ব্রাদারের সেই ভাষণের কপিতে অতীতের ভবিষ্যদ্বাণী মুছে ফেলে নতুন করে যা ঘটেছে সেটাকেই ‘বিগ-ব্রাদারের ভবিষ্যদ্বাণী’ হিসেবে দলিলে রেখে দেয়া।
ধরা যাক, একটি সংস্থা ‘এফএফসিসি।’ বিগ-ব্রাদার ১৯৮৩ সালে ৩ ডিসেম্বর সেই সংস্থাটির প্রশংসা করেছেন এবং সেই সংস্থার নেতৃস্থানীয় ‘উইদার’ নামক এক সদস্যকে খেতাবে ভূষিত করেছেন। মাস কয়েক পরে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই সেই সংস্থাটিকে ভেঙে দেয়া হলো এবং ‘উইদার’ ও তার সহকর্মীদের গুম করে ফেলা হলো। উইন্সটনের কাজ হচ্ছে ‘এফএফসিসি’ নামক কোনো সংস্থা যে কোনোকালেই ছিল না, তার দলিল তৈরি করা এবং এই প্রমাণ লিপিবদ্ধ করা যে, ‘উইদার’ এবং সহকর্মী বলতে দেশে কখনো কারো অস্তিত্ব ছিল না; বরং সে জায়গায় কর্মরত ছিলেন কমরেড অগিলিভি নামক এক বিপ্লবী। এই হচ্ছে ‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ’-এর কাজকর্মের ধরন।
যাহোক, ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটিতে আরো দেখা যায় ‘ওসানিয়া’ নামক সেই দেশে ‘মিনিস্ট্র অব ট্রুথ’সহ সব মিনিস্ট্রিতেই ‘ঘৃণার’ জন্য দুই মিনিট করে একটা ‘অনুষ্ঠান’ আবশ্যিকভাবেই প্রতিপালিত হয়। কোনো একটা বিষয়কে কিংবা কোনো একজনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিয়ে প্রতিদিন এই ‘ঘৃণার-অনুষ্ঠান’ একটা নির্দিষ্ট সয়মকালের জন্য পরিচালনা করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে ওই মুদ্দতে সরকারি সব বক্তৃতায়, বিবৃতিতে, রেডিও, টিভিতে, খবরের কাগজে এবং প্রকাশিত সব বইপুস্তকে সেই বিষয় এবং ব্যক্তিকে প্রতিনিয়ত তুলা ধুনা করা হয়। এবং ‘ঘৃণ্য আবর্জনা’ হিসেবে মানুষের মনে তা গেঁথে দেয়ার প্রয়াস চলে। সার্বক্ষণিক এই ইনডকট্রিনেশন সর্বস্তরে এতই প্রভাব বিস্তার করে যে, দুই মিনিটের ওই ‘ঘৃণা-অনুষ্ঠানেই’ অনেকে চিৎকার করে সেই বর্জিত বিষয় সম্পর্কে ঘৃণা প্রকাশ করতে থাকেন এবং সেই ঘৃণ্য-ব্যক্তির বিরুদ্ধে কণ্ঠের সব বিষ ঢেলে গালাগাল দিয়ে উঠেন।
‘১৯৮৪’ উপন্যাসে দেখা যায়, ঘটনাচক্রে স্মিথ উইন্সটন এবং জুলিয়া পরস্পরের প্রেমে পড়েন এবং সংগোপনে উভয়ে মিলিত হতে থাকেন। কিন্তু একদা তাদের হাতেনাতে ধরা পড়তে হয়। তারপর শুরু হয় তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন।
উইন্সটন একদা তার ডায়েরিতে লিখেছিলেনঃ ‘দুইয়ে দুইয়ে চার হয়... এই কথা বলতে পারার স্বাধীনতাই সত্যিকার স্বাধীনতা।’ ডায়েরিতে এই কথা লেখার ব্যাপারটা যন্ত্রের কাছে ধরা পড়ে যায়; এবং এই কথাটি লেখার জন্য তাকে চরম দণ্ড পেতে হয়। অত্যাচার ও নির্যাতনের এক পর্যায়ে উইন্সটন স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ‘অতীতকে যে নিয়ন্ত্রণ করে সেই নিয়ন্ত্রণ করে ভবিষ্যৎকে; আর বর্তমানকে যে নিয়ন্ত্রণ করে সেই নিয়ন্ত্রণ করে অতীতকে।’
আসলে এটি বিগ-ব্রাদার শাসিত ‘ওসানিয়া’ নামক সেই দেশের শাসক-পার্টির একটি অত্যাচার মুখরোচক স্লোগান।
ও ব্রায়েন নামক জনৈক কর্মকর্তা উইন্সটনকে একবার বলেছিলেনঃ ‘আমরা (মানে পার্টি) সব নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ করি এবং নিয়ন্ত্রণ করি মানুষের স্মৃতিকেও। আর যেহেতু অতীতের অস্তিত্ব শুধু নথিপত্রে এবং স্মৃতিতে সেহেতু অতীতকেও নিয়ন্ত্রণ করি আমরাই।’
৪.
‘১৯৮৪’ উপন্যাসের আরেক বক্তব্য হচ্ছে, বিগ-ব্রাদার শাসিত বিশ্বে নবতর অভিধান ও শব্দ তৈরি হয়ে থাকে। শব্দের সংখ্যা কম। কিন্তু একই শব্দ বা বাক্য আসে ঘুরে ফিরে। মানুষের অভিধানের অনেক শব্দ, আর সে কারণেই মানুষের মনে অনেক কথা জন্ম নেয়। চিন্তার-অপরাধ সৃষ্টি হয় সেই কারণেই। সুতরাং বিগ-ব্রাদার এমন এক ভাষা সৃষ্টিতে রত যে ভাষার শব্দ কম। ভাষার শব্দের এই সংখ্যাল্পতাই চিন্তার পরিধিকে ছোট করে দেবে। ‘চিন্তা-অপরাধ’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ চিন্তা করার জন্য মানুষ কোনো বাড়তি শব্দই খুঁজে পাবে না।
জর্জ অরওয়েল তার এই কালজয়ী উপন্যাসে লিখে গেছেনঃ ‘এভাবে বিগ-ব্রাদারের কল্যাণে ২০৫০ সালের মধ্যে অথবা তারো আগে, পুরাতন ভাষার সকল জ্ঞান লুপ্ত হবে। অতীতের সকল সাহিত্য ধ্বংস হয়ে যাবে।’
মজার কথা এই যে, চিন্তাভাবনা করে মানুষের ভাবনা-চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করার এই মতলবটি যে ব্যক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন, ‘সায়েম’ নামের সেই ব্যক্তিটিও একদিন ‘না’ হয়ে গেলেন। কেননা বিগ-ব্রাদার এ ধরনের চিন্তাভাবনা করতে পারা লোককে বরদাশত করতে রাজি নন।
ধরা পড়ার পর স্মিথ উইন্সটন যে নির্যাতন সেলে বন্দী ছিলেন, একদা সেই সেলে বন্দী হয়ে এলেন কবি এ্যাম্পল ফোর্থ। তার অপরাধ, তিনি কিপলিংয়ের কবিতার একটা সমগ্র-সঙ্কলন ‘সম্পাদনা’ করেছিলেন। কিন্তু ‘সম্পাদনার’ পরেও একটা কবিতায় ‘রড’ শব্দের অন্ত্যমিলে ‘গড’ শব্দটা থেকে গিয়েছিল। কবি এ্যাম্পল ফোর্থ বলেছিলেন, ‘কী করা যাবে, রড শব্দের অন্ত্যমিল-যুক্ত শব্দ গোটা ডিকশনারিতে রয়েছে মাত্র দু’টি। দিনের পর দিন মাথা ঘামিয়েও কিপলিংয়ের ওই কবিতাটিতে রড-এর সাথে মিল দিতে গিয়ে ‘গড’ ছাড়া বাড়তি আর একটা শব্দও খুঁজে পাই নাই।’
উল্লেখ্য, পার্সনস নামের যে হোটেলওয়ালা স্মিথ উইন্সটনকে জুলিয়ার সাথে প্রেম করার অপরাধে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, একদিন সেই হোটেলওয়ালা পার্সনসও ‘চিন্তা-অপরাধী’ হিসেবে সেই নির্যাতন সেলে নীত হন। তাঁর অপরাধ, ঘুমের মধ্যে তিনি নামি বিড় বিড় করে বলেছিলেনঃ ‘বিগ-ব্রাদার নিপাত যাক।’ মজার কথা এই যে, ঘুমের মধ্যে পার্সনস যখন বিড় বিড় করে এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন তা শুনে ফেলেছিল তারই সাত বছরের মেয়ে। আর যায় কোথায়। সেই মেয়েই বাপকে ধরিয়ে দিয়েছিল পুলিশের হাতে ‘চিন্তা-অপরাধী’ হিসেবে।
৫.
১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখের সুবিখ্যাত নিউজউইক পত্রিকার ‘আইডিয়াজ’ বিভাগে জর্জ অরওয়েলের এই সাড়া জাগানো ‘১৯৮৪’ উপন্যাস সম্পর্কে এক চমৎকার নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল। নিবন্ধটি রচনা করেন ডেভিড গেলম্যান। নিবন্ধটির নাম ‘স্লোওপিং টুওয়ার্ড ১৯৮৪’। নিবন্ধের শুরুতেই গেলম্যান ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের সেই সুবিখ্যাত শেষ কয়টি ছত্রের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন এইভাবে ‘যা হবার ভালই হয়েছে। সবকিছুই ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছে সংগ্রামও শেষ। তিনি (নায়ক উইন্সটন) এখন নিজেকেই জয় করতে পেরেছেন। এখন তিনি বিগ-ব্রাদারকে ভালোবাসেন।...’
গণতন্ত্রবিহীন স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পড়ে মানুষ যে কিভাবে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে, এই যেন তারই এক প্রামাণ্য দলিল। অন্যকথায়, জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি যেন সব দেশের সব কালের স্বৈরশাসনাধীন মানবাত্মার এক তীব্র আর্তনাদ।
‘১৯৮৪’ সাল কবেই আমরা অতিক্রম করেছি। কিন্তু কান পাতলে এখনো কি এই বিশ্বের আকাশে বাতাসে স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে মানবাত্মার সেই আকুল আর্তনাদ আর ব্যাকুল আর্তি শোনা যায় না?
**************************
আখ্তার-উল্-আলম
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮