- Home
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- দেশপ্রেম ও গণতন্ত্র
দেশপ্রেম ও গণতন্ত্র
- By National Days
- Published 03/26/2008
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- Unrated
১৭৫৭ সালের ষড়যন্ত্রমূলক পলাশীর যুদ্ধের পরে মুর্শিদাবাদের রাজকোষ যখন ক্লাইভের ((Lord Clive)জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তখন তিনি বিস্ময়বিহ্বল হয়ে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে দেখেন এবং ভাবতে থাকেন রুবি-ডায়মন্ডখচিত স্বর্ণ ও রৌপ্যের এমন সমাহার, এত মূল্যবান দুর্লভ সম্পদের এমন সংগ্রহ কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন হওয়া কি সম্ভব? লর্ড মেকলে (Macaulay)তার Critical & Historical Essays গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে লেখেন, মুর্শিদাবাদ থেকে এসব সম্পদ ফোর্ট উইলিয়ামে নিয়ে যেতে ব্যবহৃত হয়েছিল শতাধিক নৌযান। এই নৌযানগুলো যখন নদীপথে যাত্রা শুরু করে তখন হাজার হাজার নিরাসক্ত মানুষ নদীতীরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল। মেকলে এই ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যদি একটি করে ঢিল ছুড়ত তাহলে সব নৌকা নদীর গর্ভে নিমজ্জিত হতে পারত। তা হয়নি, কেননা নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হৃদয়ে এই ভাবনা এতটুকু স্পন্দিত হয়নি যে, নৌকাভর্তি সম্পদরাজি তাদের বা তাদের দেশের। এ সম্পদ যে তাদের কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে তার বিন্দুমাত্র তাদের অনুভবে ঢেউ তোলেনি। রাজা-বাদশাহ তাদের কাছে বহু দূরের মানুষ। তাদের চিন্তাভাবনা বা আশা-আকাঙ্ক্ষার এতটুকু সেই দূরের মানুষেরা ধারণ করেন না। তারা শুধু সময়মতো খাজনা পেলেই খুশি। সাধারণ মানুষেরা তা দিয়ে নিরাপদে জীবন কাটায়। রাজরাজড়ার যুদ্ধবিগ্রহের কথা তাদের কেউ কেউ মাঝে মধ্যে শোনে বটে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। পলাশীর আম্রকাননে বেশ কিছু মানুষকে তারা মারামারি করতে দেখেছে। কিন্তু ওরা কারা বা কী জন্য মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে তা ভাববার আগ্রহ বা সময় কোনোটিই তাদের ছিল না।
দেশপ্রেম বলতে আজকে আমরা যা বুঝি তার বিন্দুমাত্র উন্মেষ ঘটেনি তখন। ঘটবেই বা কী করে? নবাব ছিলেন তার নিজস্ব পৃথিবীতে বন্দী। আর প্রজারা ছিলেন নিজেদের ক্ষুদ্রস্বার্থ নিয়ে সঙ্কীর্ণ আত্মস্বার্থের চার দেয়ালে আবদ্ধ। দেশপ্রেম স্বতঃস্ফুর্তভাবে জাগ্রত হয় না। বৃষ্টির মতো আকাশ থেকেও তা ঝরে পড়ে না। ফরাসি ইতিহাসবিদ লাভলে (Loveleye) ফ্রান্সে দেশপ্রেম জাগৃতির কাহিনী বিবৃত করে বলেনঃ ‘ফরাসি জাতি বিপ্লবের পর থেকেই ফ্রান্সকে ভালোবাসতে শিখেছে, কারণ তখন থেকেই তারা শাসনসংক্রান্ত বিষয়ে অংশগ্রহণ করে তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতে শিখেছে’ ('The French people never began to love France until after the Revolution when they were admitted to a share in its government')।
দেশপ্রেম নাগরিকদের মনে আপনা-আপনি জন্মলাভ করে না। এটি অনেকটা প্রস্ফুটিত লাল গোলাপের মতো। হৃদয়বান মালী যেমন তার বাগানের মাটিকে মনের মতো করে চাষ করে, মাটিতে সার দিয়ে উর্বর করে গোলাপের চারাটি রোপণ করে, রোপণের পরে প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে, পাশের আগাছা দূর করে, গাছটি বড় হলে অপ্রয়োজনীয় ডালপালা কেটে-ছেঁটে, মনের সব রঙ মিশিয়ে প্রহর গুনতে থাকে কখন গোলাপের কুঁড়িটি প্রস্ফুটিত হবে। তারপর একদিন ভোরে প্রস্ফুটিত লাল গোলাপটি দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে চিৎকার করে সবাইকে বলে বেড়ায়, আমার বাগানের গোলাপটি দেখে যাও। গণতন্ত্রের কাজ হলো ঠিক এমনিভাবে নাগরিকদের মনে দেশপ্রেমের লাল গোলাপটি বিকশিত করা। গণতন্ত্রই হলো দেশপ্রেমের কুঁড়ির বিকশিত করার মালী।
দেশপ্রেম কোনো বিমূর্ত বা ভাবমূলক কোনো বিষয় নয়। দেশের মাটিকে ভালোবাসা, দেশের মানুষের প্রতি দরদ, দেশের স্বার্থের সাথে একাত্মতা, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি-কৃষ্টির প্রতি গৌরববোধ, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্য প্রাণপণ করার দৃঢ়সঙ্কল্প এ সবই দেশপ্রেমের অভিব্যক্তি। যেকোনো স্বাধীন দেশের নাগরিকদের সবচেয়ে মূল্যবান অলঙ্কার হলো দেশপ্রেম। যে দেশের নাগরিকদের মনে এই অনাবিল ভাবের সৃষ্টি হয়নি তা দরিদ্র, নিঃস্ব, হতশ্রী, দুর্ভাগ্যপীড়িত।
বিশ্বের এই অঞ্চলে দেশপ্রেম জাগ্রত হতে শুরু করে কিছু ইতিবাচক এবং কিছু নেতিবাচক উপাদানের প্রভাবে। পলাশীর যুদ্ধের প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে একটি বেনিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে আসে ভারতবর্ষের বিরাট ভূখণ্ডের বৃহত্তম অংশ। এ সময়ে সেই বিদেশী কোম্পানির কর্মকর্তা-নফর-চাকরদের হাতে দেশের সাধারণ মানুষ এমনভাবে লাঞ্ছিত, উৎপীড়িত, পদদলিত হয় যে, বিদেশী শাসকদের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা যেমন তাদের মনে সঞ্চিত হতে থাকে, অন্য দিকে পীড়িত, ক্লিষ্ট, অবহেলিত মানুষেরাও নিজেদের সবহারা বঞ্চিতদের পঙ্ক্তিতে দেখে এক ধরনের একাত্মতা অনুভব করতে শুরু করে। এই অনুভূতি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম সূচনাকারী উপাদান যা এক পর্যায়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণের পার্থক্য মুছে ফেলে। অন্য দিকে আঠারো শতকের সত্তর দশকে শাসনব্যবস্থার স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নতুন সংগঠন তৈরি এবং ওই সব সংগঠনে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কিছু ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করার ফলে এই ধারা আরো শক্তিশালী হয়। পরবর্তী পর্যায়ে নির্বাচন ব্যবস্থা, তা যতই অসম্পূর্ণ এবং একদেশদর্শী হোক, প্রবর্তিত হলে জনসাধারণের মধ্যে আত্মসচেতনতা আরো বৃদ্ধি পায় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভীপ্সায় স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়। আত্মসচেতনতার ছোট্ট ছোট্ট দলগুলো জাতীয়তাবোধের সুস্পষ্ট প্রত্যয়ে তখন থেকে রূপ লাভ করতে শুরু করে। তখন থেকে দেশপ্রেমের হীরা-জহরতে রূপান্তরিত হতে থাকে। গণতন্ত্র ও সুশাসন কিন্তু একই সূত্রে গ্রথিত। আত্মসচেতনতায় সমৃদ্ধ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় এর জন্ম। সুশাসনে এর শ্রীবৃদ্ধি। গণতন্ত্রে এর পরিপূর্ণতা। জাতীয়তাবোধের বাতাবরণে এসব সূত্র বেড়ে ওঠে। অন্য কথায়, জনগণের মধ্যে আত্মসচেতনতা স্বাধীনতার স্পৃহা জাগ্রত করে। স্বাধীনতা সুশাসনের দাবিকে অপরিহার্য করে তোলে। সুশাসনের পথ ধরে আসে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশে দেশপ্রেমের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে।
সুশাসন ও গণতন্ত্র একই সাথে পথ চলে। একটি পিছিয়ে পড়লে অন্যটি হাত ধরে টেনে তোলে। অন্য কথায়, সুশাসনকে সার্থক করে তোলে গণতন্ত্র। যে সমাজে দু’টিই অনুপস্থিত, সেই সমাজে দেশপ্রেমের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। জনসাধারণের মধ্যে দেশপ্রেমের পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে তাই অপরিহার্য হলো সেই সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অর্থপূর্ণ করে তোলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। সুশাসন নিশ্চিত হলে অর্থাৎ শাসকবর্গের দায়িত্বশীলতা (Responsibility) নিশ্চিত হলে এবং জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতা (Accountability) প্রতিষ্ঠিত হলে, বিশেষ করে তাদের নীতি (Policy) জনকল্যাণের লক্ষ্যে স্বচ্ছ (Transparent) হলে এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে জনগণের ব্যাপক সম্পৃক্ততা (Largescale involvement) নিশ্চিত করতে পারলে জনগণের হৃদয় দেশপ্রেমে ভরে ওঠে।
১৯৪৮-৫২ সময়কালে আমাদের দেশে ভাষা আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের দিকে তাকিয়ে দেখলে অনুধাবনে এতটুকু অসুবিধা হবে না যে, পূর্ববাংলার জনগণ তখনই দেশপ্রেমের অমৃতবারিতে গভীরভাবে সিক্ত হওয়ার সুযোগ লাভ করে যখন তারা আত্মপরিচয়ের সন্ধান লাভ করে এবং অনুভব করে তারা স্বতন্ত্র, তারা ভিন্ন, তারা একক, অনবদ্য। তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য স্বতন্ত্র। তাদের গন্তব্য ভিন্ন। তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য আলাদা। শুধু ভাষা নয়, জীবনবোধও স্বতন্ত্র। তারা স্বতন্ত্র এক জাতি। একই জাতীয়তাবোধের চাদরে মোড়া সুনির্দিষ্ট এক ভূখণ্ডে বসবাসকারী এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জনসমষ্টি। তাই বলি, ভাষা আন্দোলন যদি ওই সময়ে না হতো তাহলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ঘটত না, এমনকি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে দলে দলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মোৎসর্গের মহোৎসবে যোগ দিতেও জনগণ ছুটে যেত না। তবে সাথে সাথে এও স্মরণযোগ্য যে, কোনো জনপদে সবাই যে দেশপ্রেমিক হয়ে উঠবে তা নয়, কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মস্বার্থ বা গোষ্ঠিস্বার্থের প্রাবল্য এমন যে, দেশপ্রেমকে ছাপিয়ে সে ক্ষেত্রে রাজত্ব করে একধরনের সঙ্কীর্ণ আত্মকেন্দ্রিক এবং দলীয় চেতনা। সেই অন্ধকার রাজ্যে পথ হারায় দেশপ্রেমের শ্বেতকপোত।
আগেই বলেছি, দেশপ্রেমের নির্মল চেতনার পরিচর্যাকারী মালী কিন্তু গণতন্ত্র, কেননা প্রকৃত গণতন্ত্রে জনগণ প্রতিনিয়ত অনুভব করতে পারে, দেশ তাদের, দেশের সম্পদ তাদের, দেশের মানুষ তাদের, দেশের সংস্কৃতি তাদের। অন্য ক্ষেত্রে আপসকামিতা চলে। কিন্তু দেশের বা জাতীয় স্বার্থের সাথে কোনো আপস নেই। কোনো আপস নেই দেশের জনগণের স্বার্থের সাথে। এ জন্য দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যথার্থ বিকাশ হতে হবে। পাঁচ বছর পর একবার ভোটদানের সুযোগের গণতন্ত্র এ লক্ষ্যে মোটেই কার্যকর হবে না। কেন্দ্রে যেমন জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সরকার গঠিত হচ্ছে, ঠিক সেই আদলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে এবং পৌরসভা ও করপোরেশন পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার গঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে সরকার গঠিত হওয়াই যথেষ্ট নয়, সব পর্যায়ে সরকার যেন জনগণের কাছে দায়িত্বশীল হয়, সরকার যেন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে, সরকারি নীতি যেন স্বচ্ছ হয় এবং নীতি প্রণয়ন ক্ষেত্রে যেন জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় তাও অপরিহার্য। কোনো রাজনৈতিক সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করা খুব কঠিন কাজ। এ জন্য জনগণকে যেমন রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও তাদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া অপরিহার্য। আর এসবের প্রেক্ষাপটে থাকতে হবে সুশাসনের আশীর্বাদ, বিশেষ করে সমাজব্যাপী আইনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনে দায়িত্ববোধ এবং বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা। সবকিছুর উপরে প্রয়োজন গণঅধিকার সংরক্ষণে জাতীয় নেতৃত্বের দৃঢ়সঙ্কল্প।
**************************
এমাজউদ্দীন আহমদ
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮