- Home
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- সমান্তরাল নয় সম্পূরক
সমান্তরাল নয় সম্পূরক
- By National Days
- Published 03/26/2008
- স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ
- Unrated
ইতিহাসে দেখা যায়, কেউ বড় হয়ে জন্মগ্রহণ করে। কেউ আবার স্বীয় চেষ্টায় বড় হয়। কেউ বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। আবার কারও কারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করতেও দেখা যায়। ব্যাপারটিকে কালজয়ী নাট্যকার উইলিয়াম সেক্সপিয়ার বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ ‘সাম আর বর্ন গ্রেট, সাম অ্যাসিভ গ্রেটনেস, সাম হ্যাভ গ্রেটনেস থ্রাস্ট আপন দেম।’
সময় এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির আনুকূল্যও একজন নেতার উত্থানে বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতাদের ভূমিকা তথা অবদান মূল্যায়ন করার সময় আমাদের এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যাতে মূল্যায়ন একদেশদর্শী না হয়।
আমরা দু’বার স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছি। প্রথমবার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয়বার পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে। প্রথমবারের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং সেইসঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য থেকে মুক্তি। দ্বিতীয়বারের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের অবসান এবং সেই সঙ্গে অবাঙালী আধিপত্য থেকে মুক্তি। প্রথমবারের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন ব্যারিস্টার মুহম্মদ আলী জিন্নাহ। দ্বিতীয়বারের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন সংগ্রামী সংগঠক শেখ মুজিবুর রহমান।
ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম কেন দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়েছিলো তার বিচার বিশেস্নষণ অনেক হয়েছে। আগামীতে হয়তো আরও হবে। হিন্দুত্ববাদী প্রাধান্যের ভীতি যদি এই বিভক্তিকে অনিবার্য করে থাকে তবে প্রশ্ন থাকে ভারতীয় সমাজে হিন্দুত্ববাদী প্রাধান্যের মধ্যেই তো মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল এবং শত শত বছর মুসলিম শাসকরা ভারতবর্ষ শাসনও করেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জীবনধারা সংরক্ষণ করতে অসুবিধা হলে কিংবা তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকলে সে বিষয়টি নিশ্চয়ই ইতিহাসে আলোচিত হতো। অনেকের মতো আমাদেরও ধারণা ব্রিটিশ শাসকরা মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যে কখনও হিন্দু সম্প্রদায়কে শুয়োরানী এবং মুসলমান সম্প্রদায়কে দুয়োরানী আবার কখনও মুসলমানদের শুয়োরানী এবং হিন্দুদেরকে দুয়োরানী করার নীতি-কৌশল অনুসরণ করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকেই প্রখর করে তোলে। ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’।। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা প্রায় দু’শো বছর ভারতবর্ষ শাসন করার পর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সম্মুখীন হয়। ভারত তারা ছাড়ে তবে ছাড়ার আগে তাদের বিভেদমূলক শাসনের স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যায়।
প্রথম দিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলিম বিদ্বেষে ইন্ধন যোগায়। উচ্চ শিক্ষিত হিন্দুদের অদূরদর্শী ও ঈর্ষাকাতর অংশটি এই কাজে ইংরেজদের সহযোগিতা করে। ইতিহাস বিকৃত করা, পাঠ্যপুস্তক ও সাহিত্যের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ভাবধারা প্রচার করা ইঙ্গবঙ্গীয় এক শ্রেণীর শিক্ষিত লোকের ব্রত হয়ে দাঁড়ায়। এই শ্রেণীর বাঙালী লেখক-সাহিত্যিকরাই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে সুনজরে দেখেনি। ঊনিশ শতকে বঙ্গীয় সমাজে যে নবজাগরণ দেখা দেয় তা নানা কারণে মুসলিম সমাজকে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়। বিশ শতকের হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্মলাভ করেছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠেছিল তখন ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় ছিল আর্থিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে। শুধু পিছিয়ে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়কেই নয়, নিম্ন বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়কেও আস্থায় নিতে কোন বক্তব্য বা কর্মসূচী ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ছিল না। অজ্ঞ, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আশায় উদ্দীপ্ত করতে না চাওয়া এবং না পারার কারণে মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষক প্রজা পার্টি, ফরোয়ার্ড বস্নক প্রভৃতি দলের উদ্ভব ঘটেছিল এবং এসব দল জনপ্রিয়তা লাভেও সক্ষম হয়েছিল। কংগ্রেস দলটি উচ্চ বর্ণের হিন্দু জমিদার, মহাজন শ্রেণীর স্বার্থের অনুকূলে ছিল বলেই ভারতীয় জাতীয়তা কিংবা অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ অবিভক্ত বাংলার হতদরিদ্র কৃষক ও নিম্নশ্রেণীর মানুষকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ভারত তীর্থ’ কবিতায় আর্য, অনার্য, শক, হূন, মোঘল, পাঠান, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান সকলকে এক দেহে লীন হতে দেখলেও বাস্তবে তারা কখনোই এক ভারতীয় জাতিসত্তায় একাকার হয়নি। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড·রমেশচন্দ্র মজুমদার এ বিষয়ে তথ্য প্রমাণ ভিত্তিক মূল্যবান আলোচনা করেছেন। কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল ১৯৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে অভ্যন্তরীণ ঐক্যের নীতি খুঁজে পাবার ব্যাপারে ভারতের ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “সম্ভবত পরস্পরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের মনে সন্দেহ রয়েছে এবং ভেতরে ভেতরে আমরা পরস্পরের উপর আধিপত্য করার ইচ্ছা পোষণ করি। ক্ষেত্র বিশেষে আমরা যেসব একচেটিয়া অধিকার লাভ করেছি, উচ্চতর স্বার্থের খাতিরেও আমরা সম্ভবত তা ত্যাগ করে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হতে অনিচ্ছুক। আমরা আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতাকে গোপন করছি জাতীয়তাবাদের আবরণে।”
মানুষ তার গোত্র, ধর্ম, নদ-নদীর গতি আর পর্বতমালার দিক-নির্দেশের দাসত্ব করে না। বিপুল জনগোষ্ঠী তার সুস্থ মানসিকতা ও হ্নদয়ের উষ্ণতা দিয়ে এমন এক নৈতিক চেতনা সৃষ্টি করে যাকে জাতি বলে অভিহিত করা হয়। ফ্রান্সের দার্শনিক রেনানের উপরোক্ত বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ইকবাল বলেন, “
মুসলিম লীগের রাজনীতি সম্প্রদায় ঘেঁষা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতিও উদারতর ছিল না। দীর্ঘদিন থেকে ভারতীয় সমাজের ভেতরে বিভেদ-বৈষম্যের দেওয়াল থাকায় ব্রিটিশের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি সহজেই ফলপ্রসূ হতে পেরেছিল। আর্থ-সামাজিক বিভেদই রাজনৈতিক চিন্তার প্রবাহকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়। পরিবেশ-পরিস্থিতির আনুকূল্য পেয়েছিল বলেই জিন্নাহর ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে যারা মনে করেন, শুধুমাত্র ধর্মীয় আবেদনের কারণে মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন লাভ করেছিল তাদের ধারণা নাকচ করে দিয়ে ডোনাল্ট এন উইলবার তার ‘পাকিস্তান’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ ‘দি কমার্স অব দি প্রোভিন্স, হাউএভার, ওয়াজ ক্লিয়ারলি ডোমিনেটেড বাই দি হিন্দুজ; এ্যাট দি টাইম অব পার্টিশন অনলি ৩৫৮ আউট অব ২,২৩৭ লার্জ ল্যান্ড হোল্ডারস ইন বেঙ্গল অয়ার মোসলেম; দি হিন্দুজ কনট্রোলড দি লার্জ এ্যান্ড প্রোফিটেবল জুট বিজিনেস; দি প্রোফেশন্স; এন্ড দি মানিলেন্ডিং অয়ার মোস্টলি হিন্দু অকুপেশন্স; এন্ড হিন্দুজ হেলড মোস্ট অব দ্য হায়ার সিভিল সার্ভিস পোস্টস।ঃদি এপিল অব পাকিস্তান ওয়াজ ফর বেঙ্গল’স মোসলেমস বোথ রিলিজিয়স এন্ড ইকোনোমিক।’
ব‘ত শতাব্দীব্যাপী হিন্দুজমিদার ও মহাজন শ্রেণীর শোষণ-পীড়ন ও আধিপত্য থেকে মুক্তি পাবার আকাঙক্ষায় অবিভক্ত বাংলার কৃষক প্রজারা সেদিন মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিল।
সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিভক্তির পথে যে আধুনিক জীবন সমস্যার মীমাংসা করা যাবে না, ইতিহাসের গতিপথে যে ভিন্নতর দ্বন্দ্ব বিরোধ দেখা দেবে, এ কথা মওলানা আবুল কালাম আজাদ অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ডিফারেন্স উইল নো ডাউট পারসিস্ট বাট দে উইল বি অফ ইকোনোমিক, নট কমুন্যাল। অপজিশন এ্যামং পলিটিক্যাল পার্টিস উইল কনটিনিউ, বাট দে উইল বি বেজড নট অন রিলিজিয়ন বাট অন ইকনোমিক এ্যান্ড পলিটিক্যাল ইস্যুজ। ক্লাস এ্যান্ড নট দি কমিউনিটি উইল বি দ্য ব্যাসিস অব ফিউচার এ্যালাইনমেন্টস এন্ড পলিসিস উইল বি শেফড এ্যকর্ডিংলি।’
ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানার ব্যাপারে যাদের কৌতূহল রয়েছে তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের শক্তিশালী সহযোগী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতার মুখে ভারতকে বিভক্ত করার কাজটি আসলেই অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। জিন্নাহর অসাধারণ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙক্ষা সেই কঠিন কাজটিকে সম্ভব করেছিলো। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজার মাইলেরও বেশি ব্যবধানে দু’টি ভিন্নধর্মী ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলে বসবাসরত একাধিক নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীকে ধর্মের ভিত্তিতে একক জাতিসত্তায় রূপান্তরিত করার কাজটি যে সম্ভব হবে না সেটা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের উপলব্ধিতে বেশ পরিষ্কার ছিল। অনেকের মতো আমাদেরও ধারণা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অবিভক্ত ভারতে ধর্মকেন্দ্রিক ঐক্যকে বড় করে দেখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে পরিবর্তিত বাস্তব অবস্থায় ধর্মের প্রতি মুগ্ধতা কেটে যায় এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। মওলানা আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য যথার্থ প্রমাণিত হয়।
আমেরিকান জাতির আদলে দেশ ভিত্তিক জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন জিন্নাহ। এ কারণে পাকিস্তানের গণপরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে নতুন রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে না দেখে তিনি রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে বড় করে দেখার কথা বলেছিলেন। কিন্তু যে কারণে ভারতীয় পরিচয়কে বড় করে দেখে ভারতীয় জাতিসত্তা সংহত করা যায়নি সেই একই সমস্যা দেখা দেয় পাকিস্তানী জাতিসত্তাকে সংহত করার প্রশ্নে। প্রথমেই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে চরম ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে নিজের চিন্তা পুনর্গঠনের আগেই জিন্নাহ ইন্তেকাল করেন। এরপর তার দক্ষিণ হাত হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার লিয়াকত আলী খানও আততায়ীর গুলিতে অকালে লোকান্তরিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা সত্ত্বেও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানী রাজনীতিতে উপেক্ষিত। তাঁর প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পাকিস্তান আগাগোড়া চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। তবুও অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে স্বল্প সময়ের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন গণতন্ত্রের পথে পাকিস্তানকে পরিচালিত করতে। রাষ্ট্রভিত্তিক পরিচয়কে সংহত করতে তিনিও সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ডিটেকটরী শাসনে পাকিস্তানের অর্থনীতি সবল হলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য সংহতিকে দুর্বল করে তোলে। রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে দুঃখ ভারাক্রান্ত হ্নদয়ে তিনি রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেন। তার উত্তরসূরী জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রশংসিত হন। কিন্তু গোল বাধে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে। সত্তরের নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবুর রহমান জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু জাতীয় সংসদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে বিরোধী দলের নেতা হতে অঙ্গীকার করেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে পরে সে অধিবেশনের তারিখ পিছিয়ে দেয়া হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে সন্দেহ-সংশয় ঘনীভূত হতে থাকে। বিরোধ মীমাংসার জন্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বসে ঢাকায়। তবে ঢাকার বৈঠকে বসার আগে পূর্ব-পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে চলতে সক্ষম কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম এম আহমদের সঙ্গে আলোচনায় বসে মনস্থির করে আসেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বললেও ভুট্টোর চাপের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকেন। পাক সেনাবাহিনীতে ভুট্টোর লবি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বিভ্রান্ত করতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কিংবা জুলফিকার আলী ভুট্টোর উপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করার মতো সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল না আওয়ামী লীগের। পশ্চিম পাকিস্তানের সুশীল সমাজকেও নির্বাচনের রায় বাস্তবায়নে কোন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। পাকিস্তানের সিভিল প্রশাসনে কিংবা সেনাবাহিনীতে বাঙালী অফিসারগণ কোন কার্যকর ভূমিকা পালনের অবস্থায় ছিলেন না।
পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো বরাবরের মতো পূর্বাংশের বাঙালী জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙক্ষার প্রতি বৈরী মনোভাব প্রদর্শন করছিল। সঙ্গত কারণে বাঙালী মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। ভোটের রায় অনুকূলে থাকার পরও শেখ মুজিব ক্ষমতায় যাবার ব্যাপারে অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। তাঁর সমর্থক ছাত্রলীগ নেতাদের একটি অংশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার সমূহ আশঙ্কা দেখা দেয়। শেখ মুজিব ধৈর্য হারিয়ে ফেলতে থাকেন। এরকম পটভূমিতে ৩ মার্চের সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। শেখ মুজিব ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আহূত এক বিশাল জনসভায় গোটা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং সেই সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর ভাষণ রেডিও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার না করায় তিনি বক্তৃতায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। স্বাধীনতাকামীদের উজ্জীবিত করার জন্য তিনি তার নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘মুক্তির’ সংগ্রাম বলে অভিহিত করেন। অবশ্য ৪টি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়ে সমঝোতায় উপনীত হবার পথও উন্মুক্ত রাখেন। স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হলে তাকে মোকাবেলা করার রণনীতি-রণকৌশল পর্যন্ত তিনি তার ভাষণে ব্যাখ্যা করেন। ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার বক্তব্য বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বক্তব্যের আলোকে প্র‘তিমূলক কাজ খুব কমই করা হয়। যার চরম মাশুল দিতে হয় জাতিকে।
দীর্ঘদিন যাবৎ আওয়ামী লীগের উপর জুলুম-পীড়ন চলার কারণে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি খুব সবল ছিল না। আওয়ামী লীগের সমর্থক দলগুলোও দুর্বল ছিল। অন্যদিকে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রাখলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং তার অংগ সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ ভোটের আগে ভাতের দাবি তুলে নির্বাচন বর্জন করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, পূর্ব-বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, ভাষা সৈনিক অলি আহাদসহ যেসব নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবের উপর ঐ সময়ে চাপ সৃষ্টি করছিলেন তাদের কারও মজবুত সংগঠন ছিল না। এই দুর্বলতার কথা মাথায় রেখে সংকট সন্ধিক্ষণে শেখ মুজিব স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার কাজটি সম্মিলিতভাবে সম্পন্ন করার জন্য সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠনের উপর জোর দিলে অনেক দুর্বলতা হয়তো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতো। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণে তিনি জোর দেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠনের উপর। ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যে দু’সপ্তাহ সময় পাওয়া গিয়েছিল সেই স্বল্প সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় এবং গ্রামে-গঞ্জে যদি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেও সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হতো তাহলেও স্বাধীনতা যুদ্ধ অনেক বেশী সংগঠিত রূপ লাভ করতো। কিন্তু এ সাংগঠনিক কাজটিও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছিল।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় কেন এসেছিলেন এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেরকে কেন আলোচনায় বসিয়েছিলেন তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, আলোচনা ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে, এমন আশার আলো ঝলক দিয়ে ওঠার পর কেন সবকিছু ভেস্তে গেলো তা আজও আমার, আপনার এমনকি দেশবাসীরও অজানা থেকে গেছে। ড· কামাল হোসেনের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, ৬ দফা মেনে নেয়ার পর বঙ্গবন্ধু তাকে পরবর্তী বৈঠকে পাকিস্তানের নাম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বিষয়টি ড· কামাল হোসেন পরবর্তী বৈঠকে না তুলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, মেজর জেনারেল পীরজাদা প্রমুখকে আগেই অবহিত করেন। বিচারপতি কর্নেলিয়াস কামাল হোসেন প্রস্তাবিত ‘কনফেডারেশন অব পাকিস্তান’-এর স্থলে ‘ইউনিয়ন অব পাকিস্তান’ করার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন। কিন্তু মেজর জেনারেল পীরজাদা একে মৌলিক পরিবর্তন মনে করেন এবং পরবর্তী বৈঠকের দিনক্ষণ টেলিফোনে জানানোর কথা বলে আলোচনায় ইতি টানেন। ২৫ মার্চ সকাল থেকে রাত অবধি ড· কামাল হোসেন পীরজাদার ফোনের জন্য অপেক্ষা করেন। ২৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে ৩২ নম্বর ধানমন্ডি ত্যাগ করার সময় বঙ্গবন্ধু তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন বৈঠকের ব্যাপারে কোন ফোন তিনি পেয়েছেন কি না। তিনি এর নেতিবাচক জবাব দিয়ে ৩২ নং ধানমন্ডি থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
আনুষ্ঠানিক আলোচনার ফলাফল যা-ই হোক, তার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘোষণা না করে ২৫ মার্চ গভীর রাতে বাঙালী জনগোষ্ঠীর উপর সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান মানব ইতিহাসে আর একটি বর্বরতার কালো অধ্যায় সংযোজন করেন। পাকিস্তানী কামানের গোলায় জন্ম নেয় একটি নতুন দেশ, নাম তার বাংলাদেশ।
ঘটনার আকস্মিকতায় সকলে যখন হতবাক, মুজিবের অসহযোগ আন্দোলন ও তার কতৃêত্ব যখন সামরিক আক্রমণের সম্মুখীন তখন পাল্টা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণে এগিয়ে আসেন মেজর জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার অনুকূলে গর্জে ওঠে একটি সামরিক কণ্ঠস্বর। শেখ মুজিবের আরদ্ধ কাজকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে নেয়ার সংকল্প ঘোষণা করেন তিনি। সেদিন কি বার ছিল, ক্যালেন্ডারে কোন তারিখ ছিল, ঘড়িতে কটা বেজেছিল- সেটা মিলিয়ে দেখার মত মনের অবস্থা শুধু আমার নয় অনেকেরই ছিল না। সবাই উৎকর্ণ ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারের ঘোষণা শোনার জন্য। সীমাহীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা মুহূর্তে মুজিবের পক্ষে মেজর জিয়ার কক্তে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাবার আহ্বান আমার মত অসংখ্য স্বাধীনতাকামীকে উজ্জীবিত করেছিল। এইভাবে দুই রহমান- শেখ মুজিবর রহমান ও জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্মরণীয়-বরণীয় হন। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার প্রশ্নে তাদের দু’জনের ভূমিকা কোনভাবেই সমান্তরাল ছিল না। এ দু’জনের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সমান্তরাল ভূমিকা হিসেবে দেখার কিংবা দেখানোর কোন সুযোগ নেই। আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা থেমে গেলে সত্যিকারের ঐতিহাসিকরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার সম্পূরক হিসেবেই দেখবেন এবং মূল্যায়ন করবেন।
**************************
সৈয়দ তোশারফ আলী
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০০৮