National Events - http://events.amardesh.com
স্মৃতিচারণঃ মুক্তিযুদ্ধ আর ‘স্বাধীনতা’
http://events.amardesh.com/articles/11/1/aaaaaaaaaaa-aaaaaaaaaaa-aa-lsquoaaaaaaaaarsquo/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 12/16/2007
 
(অরুণাভ সরকার) মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ১৯৭১ সালে যেমন ছিল, হয়তো এখনো তেমনই রয়েছে। অনেকেই এখনো আমাকে অনুরোধ করেন, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলুন। তখন কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কী কী করেছিলেন, দেখেছিলেন কী কী­ এসব। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও নিজ হাতে কোনো মারণাস্ত্র ধরিনি।

স্মৃতিচারণঃ মুক্তিযুদ্ধ আর ‘স্বাধী

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ১৯৭১ সালে যেমন ছিল, হয়তো এখনো তেমনই রয়েছে। অনেকেই এখনো আমাকে অনুরোধ করেন, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলুন। তখন কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কী কী করেছিলেন, দেখেছিলেন কী কী­ এসব। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও নিজ হাতে কোনো মারণাস্ত্র ধরিনি। কাজেই এখানে আমার ‘স্বাধীনতা’র গল্প বলা যেতে পারে; কিন্তু সে ‘স্বাধীনতা’ আমার যখন যেমন খুশি চলার বা বলার সুযোগ নয়। ‘স্বাধীনতা’ একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা।

‘স্বাধীনতা’র কথা বলার আগে একটু পূর্বকথা প্রয়োজন। সে কথাও ১৯৭১ সালের। আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি। সহ-সম্পাদক।
মার্চ মাসে গণআন্দোলনে উত্তাল ঢাকাকে ফেলে আমি একদিন নোয়াখালী গিয়েছিলাম, নোয়াখালী তখন প্রায় এক মুক্ত এলাকা। নোয়াখালীর তখনকার বিখ্যাত নেতাদের মধ্যে ছিলেন মালেক উকিল, নূরুল হক এবং প্রায় সর্বজনপ্রিয় ‘কচি ভাই’। আমি উঠেছিলাম মাইজদীকোর্টে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের দেলওয়ার হোসেন সাহেবের বাসায়। কয়েক দিন বেশ আনন্দেই কাটে সেখানে। শেষে ঢাকায় ফিরছিলাম ২৫ মার্চ রাতে, ট্রেনে। ভোর রাতে ট্রেন নরসিংদী পৌঁছে থেমে যায়। তারপর আর চলবে না। লাইন উঠিয়ে ফেলা হয়েছে।

ট্রেনে আমার সহযাত্রীদের মধ্যে ছিলেন এক বৃদ্ধা আর তার নাতি। নাতির নাম সম্ভবত রফিকুল মাওলা। মাওলা খুব ছোটবেলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। বেশ ভালো ইংরেজি আর উর্দু বলেন; কিন্তু ঠেকে ঠেকে যান বাংলায়। সেটাই তার আর তার নানীমার ভয়। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তাকে ‘বিহারি’ ভেবে বসে যদি। আমি তাদের অভয় দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে আসি একসাথে। আশ্রয় নিই ছোট্ট একটা হোটেলে। সেখানেই তিন দিন দুই রাত কাটে। এর মধ্যে মাওলা আর আমি ঢাকাতেও এসেছিলাম একদিন। ঢাকাতে মাওলার বাবা আবহাওয়া অফিসের বড়কর্তা। তিনিও আমাদের ঢাকায় থাকার ইচ্ছা সমর্থন করলেন না। ফিরে যেতে বললেন।
ঢাকায় ইত্তেফাক অফিস তখন পাকিস্তানিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। লুট হয়ে গেছে গোপীবাগে আমার আস্তানা। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে আমার বৃদ্ধা মা ছিলেন একা। সেখানে যাওয়াও কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। অগত্যা নরসিংদীতেই ফিরে যাই আবার।

নরসিংদীতে তখন সবাই স্বাধীনতার পক্ষে আর তাদের নেতা সম্ভবত এক ভুইয়া সাহেব। সেই ভুইয়া সাহেবের সহায়তায় সেই রাতেই জলপথে আমাদের চাঁদপুর যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। চাঁদপুর থেকে কখনো হেঁটে, কখনো রিকশায় নোয়াখালী। কিন্তু এবার মাইজদীকোর্ট নয়, বেগমগঞ্জ।
চৌমুহনীর কাছেই বেগমগঞ্জ। থানা সদর। থানার উল্টো দিকে বিরাট মাঠের মধ্যে বিশাল এক বাড়ি, কেরানীবাড়ি। মাওলার নানাই গৃহকর্তা। তার নাম সম্ভবত লুৎফুল হক। হক সাহেব ব্যবসায়ী, চৌমুহনী বাজারে তার কাপড়ের দোকান। তার ছেলেরাও উপার্জনশীল। বেশ সচ্ছল এবং সম্ভ্রান্ত পরিবার। এই পরিবারেরই এক সন্তান, বোরহান, স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বেশ সুদর্শন এবং আকর্ষণীয় চরিত্রের মানুষ। কিন্তু আমাকে আরো বেশি আকর্ষণ করত তার অগ্রজ শাহজাহান সাহেব। শাহজাহান সাহেবের চাকরি হয়েছিল নোয়াখালী ট্রেজারিতে। কিন্তু তিনি সে চাকরি ছেড়ে দেন সেখানে ঘুষ খাওয়া প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল বলে। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে নোয়াখালীর পতন এবং দোকানপাট লুট হয়ে যাওয়ার পর শাহজাহান সাহেবের চরিত্রের এই দিকটি আরো ফুটে উঠেছিল। তিনি তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানের দুধে চিনি দিতেন না। কেন? নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলতেন, কোনো দোকানেই চিনি নেই।

আমরা বলতাম, এই যে রাস্তার ধারে এত চিনি বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলতেন,‌ ওগুলো লুটের চিনি। ও চিনি খাওয়ালে আমার সন্তানের মনেও লুটের প্রবণতা জাগতে পারে।

নোয়াখালী পতনের পর আমাকে নিয়েও বিরাট এক সমস্যা দেখা দেয় কেরানীবাড়িতে। অনেকেই বলতে থাকেন, আমার উপস্থিতি পুরো বাড়ির অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলবে। আমাকে দূর করে দেয়া হোক।

হক সাহেব বললেন, ‘না। আশ্রিতকে আমি ত্যাগ করতে পারব না।’

কেরানীবাড়িতে আমার আর বেশি দিন থাকা হলো না তবু।

তখন আমার বয়স কম। মনে অপার স্বদেশপ্রেম। বললাম, যুদ্ধে যাব। নানাভাই, অর্থাৎ লুৎফুল হক সাহেবও আপত্তি করলেন না। তিনিই সঙ্গী ঠিক করে দিলেন। ছ’সাতজন সম্ভাব্য মুক্তিযোদ্ধা মুক্তাঞ্চলে যাচ্ছিলেন প্রশিক্ষণ নিতে। নানাভাই আমাকেও তাদের সঙ্গী করে দিলেন।

বেগমগঞ্জ থেকে ত্রিপুরা সীমান্ত অনেক দূরে। সেই পথ যেতে হবে হেঁটে। অথচ হাঁটাহাঁটিতে আমার তেমন অভ্যাস নেই। আমি তবু মরিয়া। যাত্রা শুরু করলাম মধ্য রাতে।

অভুক্ত অবস্থায় হেঁটে হেঁটে ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছুই পরের দিন সন্ধ্যার আগে। সীমান্তের ওপারেই বিরাট একটা পুকুর। আমরা সেই পুকুরের পাড়ে ঘাসের উপর কিছুক্ষণের জন্য গা এলিয়ে দিই প্রথমে। আমরা জানতাম, পাকিস্তানিরা আমাদের দেখতে পাবে না সেখানে। তা ছাড়া ভারতীয় ভূমিতে আমাদের আক্রমণ করার সাহসও পাবে না সহজে।

এসব ভাবতে ভাবতে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। অনিচ্ছুক পায়ে আবার শুরু করতে হয় চলা। পাহাড় আর বনের মধ্য দিয়ে সরু পায়ে চলার পথ। তা কখনো দেখা যায়, কখনো যায় না। তবু আমরা চলতেই থাকলাম। শেষে অনেক রাতে প্রথমে যে জনপদে পৌঁছলাম, তার নাম চোতাখোলা। সেখানে উদ্বাস্তুদের আশ্রয় শিবির। মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা। সেসবের অধিকর্তা ছিলেন ফেনীর খাজা আহাম্মদ। খাজা সাহেবের নির্দেশে আমাদের আহারাদি আর রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা হয়ে যায়।

পরদিন আমার একার আগরতলা যাত্রা। যাত্রীবাহী জিপে আগরতলা পৌঁছাই বিকেলের দিকে।

আগরতলা পৌঁছানোর আগেই দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছিল, উঠব কোথায়? আগেই শুনেছিলাম, আগরতলা ছোট্ট শহর। দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ তেমন নেই। তা ছাড়া হোটেলে উঠতে যে টাকা লাগে, তা নেই আমার। তবে?

চোতাখোলাতেই শুনেছিলাম, আগরতলায় নেতৃস্থানীয় বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের মিলনকেন্দ্র হচ্ছে মেলার মাঠে এক সাংবাদিকের বাসা। আমিও সোজা সেখানে গিয়েই উঠলাম। ভদ্রলোকের নাম অনিল ভট্টাচার্য। কলকাতার একটা বড় কাগজের আগরতলা প্রতিনিধি। অনাড়ম্বর পরিচ্ছন্ন সংসার। সেখানেই আহারাদির ব্যবস্থা হলো। থাকার ব্যবস্থা হলো তার বাড়ির সম্মুখেই এমএলএ হোস্টেলে।

প্রশ্ন দাঁড়াল এবার আমি কী করব! যুদ্ধে যাওয়াই যেত। সক্ষমরা সাধারণত তাই-ই যায়। ফাঁকা ছিল অন্য একটা এলাকা। সাংবাদিকতা। আমি ঠিক করি, আমি একাই একটা সংবাদপত্র বের করব।

আমার টাকা ছিল না। তখন আগরতলায় ভালো কোনো প্রেস বা বিজ্ঞাপনদাতাও নয়। সাংবাদিকতা করার মতো লোকজন তো নয়ই। আগরতলায় বাংলাদেশী সাহিত্যিক-সাংবাদিকরা কেউ কেউ এসেছিলেন, সত্য। তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, নির্মল সেন, আসাদ চৌধুরী, শাহাদত চৌধুরী, সলিমুল্লাহ এবং ইয়াহিয়া বখ্‌ত। কিন্তু তারা কেউ সেখানে থাকেননি। কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। কাজেই সাহায্য করার মতো লোক ছিলই না। তবু শুধু ইচ্ছাকে সম্বল করে আমি এগোলাম।
বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের পূর্বাঞ্চলীয় পরিষদের সদর দফতর ছিল আগরতলায়। চট্টগ্রামের জহুর হোসেন চৌধুরী ছিলেন পরিষদের প্রধান। তিনি প্রতি সংখ্যা একশ’ কপি করে কিনে নেবেন বলে কথা দিলেন। একটি-দু’টি দোকান আর রেস্তোরাঁ দিতে চাইল ছোট ছোট বিজ্ঞাপন। সংবাদ সংগ্রহ, লেখা, সম্পাদনা ইত্যাদি সব কাজই করতে হতো আমাকে এক হাতে। ‘স্বাধীনতা’ তবু বের হলো। ট্যাবলেয়েড আকারের আট পৃষ্ঠা, দাম এক টাকা।

‘স্বাধীনতায়’ মুক্তিযুদ্ধের খবর থাকত। পাকিস্তানিদের নির্যাতনের কাহিনীও। একবার আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর একটা লেখাও ছেপেছিলাম ‘স্বাধীনতায়’। তখনকার নেতাদের মধ্যে মিজানুর রহমান চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী, জহুর হোসেন চৌধুরী, শেখ ফজলুল হক মণি, শাজাহান সিরাজ এবং আ স ম আব্দুর রব বেশ স্থান পেতেন পত্রিকাটিতে। প্রবাসী সরকারের খবরও থাকত। যোদ্ধাদের মধ্যে প্রাধান্য পেতেন মেজর জিয়া, মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর রফিক এবং মেজর (ক্যাপ্টেন) ভূঁইয়া।

ডাক্তার জাফরউল্লাহ চৌধুরীও একবার খবর হয়েছিলেন স্বাধীনতায়। তিনি তখন লন্ডনে মেডিক্যালের ছাত্র। তিনি আর তার আরেক সহপাঠী মবিন খান আগরতলায় এসেছিলেন সাহায্য নিয়ে। সে খবর বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছিল। অপ্রকাশিত একটি খবরের নায়ক ছিলেন শাহাদত চৌধুরী। তিনি থাকতেন খালেদ মোশারফের সাথে। খালেদ মোশারফ চাইতেন তার সেক্টরের খবর আরো বেশি করে ছাপা হোক স্বাধীনতায়। সে জন্য কিছু টাকা দিতেও প্রস্তুত ছিলেন তিনি। শাহাদত চৌধুরীর মাধ্যমে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে চাইলেন তিনি। শাহাদত চৌধুরী প্রস্তাব দিলেন, সেই টাকায় নিজেই আলাদা পত্রিকা করবেন তিনি। করেছিলেনও।

উদ্বাস্তুরা খুব কিনতেন ‘স্বাধীনতা’। স্থানীয়রাও। সব কপি বিক্রি হয়ে যেত বের হওয়ার পরই।

কিছুটা অনিয়মিতভাবে হলেও ‘স্বাধীনতার’ প্রকাশনা অব্যাহত ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

************************
লেখকঃ অরুণাভ সরকার
সাংবাদিক ও কবি
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭