সে সময় দেশ-জাতি-স্বাধীনতা-মুক্তিসংগ্রাম সংক্রান্ত কথা বলার জন্য ঢাকা থেকে কোনো একক কাগজ ছিল না। এ সমস্ত কথা বলার জন্য সম্পাদক অনেক ক্ষেত্রে ছিলেন, কিন্তু তাঁদের সঠিক বক্তব্য প্রকাশের অধিকার ছিল না বললেই চলে।

নিজের কথা বলতে না-পারার বেদনায় অন্য পাঁচজনের মতো আমিও বিক্ষুব্ধ ছিলাম। দৈনিক পূর্বদেশের প্রধান রিপোর্টার হিসেবে আমি পত্রিকাটির জন্ম থেকেই ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা ও মুক্তির পক্ষে কোনো একটি কথাও স্পষ্টভাবে সেদিন লিখতে পারছিলাম না। এমন অনেক শব্দ এবং বাক্য আছে, যা দিয়ে পরোক্ষভাবে নিজের বক্তব্য অনেকাংশে স্পষ্ট করা যায়। কিন্তু পত্রিকার মালিক খড়গ হাতে অফিসে অবস্থান করেন। সরকার তো তার ওপরে আছেনই।

মানসিক দিক থেকে সত্য প্রকাশের প্র‘তি থেকেও সঠিক বক্তব্যটি উপস্থাপন করতে পারছিলাম না। এ এক ধরনের সেন্সরশিপ- মানসিক বৈকল্য প্রধানত এক্ষেত্রে কাজ করে। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ব্যক্তিগত জীবন-যাত্রার পথকে কতোদূর পর্যন্ত অগমনযোগ্য করা যাবে। তবুও মানুষ স্বভাবত বিদ্রোহী। সে সত্যের সন্ধানী, সে প্রকৃত তথ্যকে উদঘাটন করতে চায়। সেই ধরনের আমি একজন সাংবাদিক ছিলাম।

পূর্বদেশ পত্রিকায় ’৭১ সালের প্রথম দিক থেকেই আমি ক্রমাম্বয়ে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিলাম। আমি আমার সম্মুখে সত্যের ময়দানে সংবাদের মৃত্যু দেখছিলাম। এই অবস্থা আমাকে কী যেন সত্য উদঘাটনে উৎসাহিত করেছিল। আমি আমার নিজের সত্য কথা বলার জন্য এমনই উদগ্রীব হয়ে উঠলাম যে, সত্যনিষ্ঠ বন্ধুদের সন্ধানে নেমে গেলাম। এই সত্যকে উদঘাটনের একমাত্র পথ ছিল আপন চিত্তের উত্থান। আর তার সহায়ক শক্তি একটি পত্রিকা। ঢাকাতে যাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল, তাদের সহানুভূতি-সদিচ্ছা থাকলেও টাকা ছিল না। সাংবাদিকতার গোড়ার দিকের এক বন্ধু আমার বক্তব্য শোনার পরে লাফিয়ে উঠলেন এবং তিনি বললেন, আমার সাহায্যের অংশের টাকা কালই তোমাকে দেবো। তিনি ঢাকা এবং করাচি উভয় স্থানেই নিজ বাড়িতে বাস করতেন। অতি সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান এই বন্ধুটি ১৯৪৮ সাল থেকে সাংবাদিকতায় আমাদের সাথে সম্পর্কিত। তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দান করেন। বিখ্যাত ডাক্তার জুবেরীর ভাতিজা এই আবিদ জুবেরী কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার সাথে নিজেকে সংমিশ্রিত করতেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি অবজারভার-এ থাকাকালীন সময় থেকেই আমার সঙ্গে সম্পর্কিত হন।

সমগ্র দেশের রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতি আমার প্রকাশিতব্য পত্রিকার অনুকূলে ছিল। পত্রিকার নাম শেষ পর্যন্ত স্থির করা হলো ’স্বরাজ’। জনগণের আশা-আকাঙক্ষা যাতে এই পত্রিকায় প্রতিফলিত হয় এবং প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পক্ষ আমরা সমর্থন করতে পারি, সে কথাই স্থির করা হলো।

’স্বরাজ’-এর ডিক্লিয়ারেশন নিতে গিয়ে প্রথমেই বিরোধিতার মুখোমুখি হলাম - ঢাকার ডিসি এক কথাতে বলে দিলেন, আমার নামে কোনো ডিক্লিয়ারেশন হবে না এবং তিনি স্পষ্টতই বললেন যে, সরকারের এই ধরনের সিদ্ধান্ত আপনার রাজনৈতিক চিন্তাধারার কারণেই। এ-কথাটা আমি আগেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। ডিক্লিয়ারেশন সর্বদাই পত্রিকার মালিকানার সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণেই যেকোনো লোকের নামে ডিক্লিয়ারেশন নেয়া যাবে না। এই ব্যাপারে অনেকের সাথে আলোচনা করার পরে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়লাম। এই সময় ঢাকায় বন্ধু জুবেরী উপস্থিত ছিল। তাঁর অফিসেই দীর্ঘ মিটিং হলো পত্রিকাটির ডিক্লিয়ারেশন ও কার্যক্রম নিয়ে। শেষ পর্যন্ত জুবেরী বললো, তার এক বন্ধুর ছেলে তখন ঢাকাতে অ্যাসিসটেন্ট ম্যাজিস্ট্রেট। এই পশ্চিম পাকিস্তানি সিএসপি যুবক বাঙালিদের ব্যাপারে উৎসাহী এবং আবিদ জুবেরীর অনুরোধ সে হয়তো মানবে। শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটির প্রকাশক ও মুদ্রকের নাম দেয়া হলো আবেদ জুবেরী এবং তিনিই তাঁর নামে এই পত্রিকার ডিক্লিয়ারেশন চেয়ে আবেদন করলেন। এই কথাটা আমরা সম্পূর্ণ গোপন রেখে জেলা অফিসে আবেদনপত্রটি প্রেরণ করি। আবেদ জুবেরী টেলিফোন করে বন্ধুপত্র ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে কথা বলেন এবং তিনি তাকে বুঝিয়ে দেন যে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন একটি বাংলা পত্রিকা দরকার। এই কথার ফাঁকেই পত্রিকার আসল রূপটি লুকিয়ে রাখা হলো। তিনি উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরেরদিন সকালে সাক্ষাৎ করলেন এবং হাতে হাতে তাঁর নামে ’স্বরাজ’-এর ডিক্লিয়ারেশন নিয়ে আসলেন।

আমি নিযুক্ত হলাম এই পত্রিকার সম্পাদক। প্রকৃতপক্ষে পত্রিকায় আমার ওপর কথা বলার অধিকার কারো রইলো না। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে এত সমস্ত ঝামেলা শেষ করে আবেদ জুবেরীর প্রকাশনায় এবং আমার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ’স্বরাজ’ পত্রিকা বের হলো (২০ ফেব্রুয়ারি)। কেউ তখনও জানে না যে, সরকারের ঘোরতর বিরোধিতার মধ্যেও ’স্বরাজ’ কীভাবে বের হলো। সে সময় আমার একান্ত বন্ধু ও ’স্বরাজ’-এর প্রকাশক-মুদ্রক আবিদ জুবেরী করাচিতে। জুবেরী টেলিফোনে পত্রিকা প্রকাশের সমস্ত খবরই পেয়েছিল। সে আমাকে যাওয়ার সময় তার হোটেলে ডেকে নিয়ে নগদ আট হাজার টাকাও দিয়েছিল। সে কেবল বললো, তুমি খাবে কী? সেজন্যই এই টাকা।

ঢাকার বাজারে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ পত্রিকা আর বের হয়নি। ঢাকার হকার অ্যাসোসিয়েশন সন্ধ্যায় আমার সাথে দেখা করে কেবলমাত্র ঢাকার জন্য দশ হাজার কপি দাবি করলেন এবং তাঁরা এই কপির টাকা নগদ আমার হাতে তুলে দিলেন। প্রতি কপির দাম ছিল তখন মাত্র তিরিশ পয়সা। হাকররা পরবর্তী সংখ্যা বিশ হাজার প্রদানের জন্য অর্ডার দিয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে এক সপ্তাহের কাগজের দামও আমার হাত তুলে দিলেন। পত্রিকাটি ছিল বারো পাতার। এই স্বরাজকে পৃষ্ঠা কমিয়ে দৈনিক করা যায় কিনা সে-কথা আমরা বিবেচনা করেছিলাম। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থা সেই সিদ্ধান্তে যেতে সহযোগিতা করেনি। স্বরাজকে তখন সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে উৎসর্গ করা হয়েছিল।

দেখতে দেখতে বিপ্লব সমৃদ্ধ মার্চ মাস এসে উপস্থিত হলো। ঢাকার সমস্ত প্রগতিশীল বিপ্লবী কবি সাহিত্যিকের এই পত্রিকায় লেখার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। অধ্যাপক শওকত ওসমানের প্রগতিশীল একটি লেখা দৈনিক পাকিস্তান ছাপতে পারেনি, সেটা আমরা ছাপালাম। আব্দুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদদীন, সা’দত আলী আখন্দ, কে·জি মুস্তফা, এনায়েতউল্লাহ খান, শহীদুল হক, আতাউস সামাদ, কামাল লোহানী, বিনোদ দাশগুপ্ত, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আওয়াল খান, তরুণ চট্টোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবির, কামরুল হাসান, এম আর আখতার মুকুল, মহাদেব সাহা, সন্তোষ গুপ্ত প্রমুখ এই পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন।

রাজনৈতিক অবস্থার দৃষ্টিতে মার্চে একবার এই পত্রিকায় দুই অক্ষরে হেডিং করা হয়েছিল ‘বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত’। এমন চরম রাজনৈতিক বক্তব্য ঢাকার কোনো কাগজ তখন ছাপতে দুঃসাহস করেনি। এই কাগজে জনগণকে বিদ্রোহ করার জন্য যে অমৃত বাণী উচ্চারণ করা হতো, তা ছিল অন্য কোনো কাগজের জন্য শিহরণমূলক। এই কাগজেই জনগণকে স্কেচসহ (চিত্র) শেখানো হয়েছিল যে, কীভাবে মর্টার নিক্ষেপ করা হয় এবং রাইফেল ব্যবহারের নিয়ম কি?

পঁচিশে মার্চ বাংলাদেশের ওপর আর্মি আক্রমণের পর পত্রিকাটিতে কোনো কর্মচারী প্রবেশ করতে পারেনি। তিরিশে মার্চ সন্ধ্যার পূর্বে আর্মির একটি দল পত্রিকাটির তোপখানা রোডস্থ অফিস ধ্বংস করে দেয়।

**************************
ফয়েজ আহমদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০০৮