স্বাধীনতা দিবসের অর্থ হল মহান বিজয়ের পবিত্র ঐতিহ্যকে রক্ষা করা- সমুন্নত রাখা। সমুন্নত রাখার প্রধান শর্তই হল একতা। দেশে দেশে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু সেজন্য বৃহত্তর দেশের কোন অমঙ্গল হতে পারে মহান স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এমন কোন কর্মকাণ্ডে নিরীহ জনতাকে জিম্মি করতে পারে না। ফরাসি চিন্তাবিদ ম্যাটসিনির সেই অমর বাণীঃ ’হু ডাইস দ্যা কান্ট্রি লিভস? হু লিভস ইফদি কান্ট্রি ডাইস? দেশ বাঁচলে মরে কে? দেশ মরলে বাঁচে কে? ড· মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বারবার বিভিন্ন সভা সমিতিতে বলতেন- ‘বাঙালী বড়ই আত্মবিস্মৃত জাতি। তারা বারবার ভুলে যায় পলাশীর বিপর্যয়, সিপাহী বিপ্লবের, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ এবং এমনই শত বিপর্যয়ের কথাঃ যা রক্তাক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসে।’
স্বাধীনতা দিবসের অর্থ হল মহান বিজয়ের পবিত্র ঐতিহ্যকে রক্ষা করা- সমুন্নত রাখা। সমুন্নত রাখার প্রধান শর্তই হল একতা। দেশে দেশে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু সেজন্য বৃহত্তর দেশের কোন অমঙ্গল হতে পারে মহান স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এমন কোন কর্মকাণ্ডে নিরীহ জনতাকে জিম্মি করতে পারে না। ফরাসি চিন্তাবিদ ম্যাটসিনির সেই অমর বাণীঃ ’হু ডাইস দ্যা কান্ট্রি লিভস? হু লিভস ইফদি কান্ট্রি ডাইস? দেশ বাঁচলে মরে কে? দেশ মরলে বাঁচে কে? ড· মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বারবার বিভিন্ন সভা সমিতিতে বলতেন- ‘বাঙালী বড়ই আত্মবিস্মৃত জাতি। তারা বারবার ভুলে যায় পলাশীর বিপর্যয়, সিপাহী বিপ্লবের, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ এবং এমনই শত বিপর্যয়ের কথাঃ যা রক্তাক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসে।’
সত্যিই ত এই সেদিনের কথা- আমরাত অনেকে নিজের চোখেই দেখছি একাত্তরে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের মর্মান্তিক আত্মদান। হানাদার বাহিনী শহরে-গ্রামে গ্রামে ঢুকে কি হিংস্র অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে- করেছে মা- বোনদের সম্ভ্রম ইজ্জত নাশ- লুটতরাজ। আমাদের কত বুদ্ধিজীবী, খ্যাতিমান শিক্ষক সেদিন বিনা দোষে, বিনা কারণে বিনা অপরাধে নিজ গৃহে পথে ঘাটে প্রাণ দিয়েছেন। আমরা কি ভুলতে পারি ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের দেবপ্রতিম শহীদ মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, দার্শনিক গোবিন্দ দেব, চলচ্চিত্রকার জহীর রায়হান, ইত্তেফাকের সিরাজ উদ্দিন হোসেন এবং এমনই কত শত দেশের সু-সন্তান- শুধু ত ঢাকায় নয়, সমগ্র বাংলাদেশ জুড়েই যাদের পবিত্র নামের নামাবলী লিখতে সহস্র পৃষ্ঠার গ্রন্থ প্রয়োজন। ভুলতে পারি কি কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট্রের দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার কথা- যাকে খুনী ইয়াহিয়ার কুকুরেরা পুত্র রবিসহ নারায়ণগঞ্জ থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এমনই কত মহান প্রাণইত রক্ত পিছল একাত্তরে হারিয়ে গেছেন- যারা আজ বেঁচে থাকলে এই হতভাগ্য জাতিকে মহান বিজয় দিবসের অর্থ বুঝাতে পারতেন। জাতি ভুলে যেত না তার মহান দায়িত্ব ও ঐতিহ্যের কথা। যাঁরা বলতেন- দেশকে দেখো ঐ পথে নয় এই পথে মিলনের পথে/সমৃদ্ধির পথে। আজ আমি আপনি এবং আপনারা যে বেঁচে আছি- এটাওত এক বিস্ময়। ১লা এপ্রিল (৭১) দেশের বাড়ী পলায়ন করতে গিয়ে আমরাওত সেদিন হানাদারদের কবল থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই- বেঁচে যান এমন অনেকেই। কিন্তু দেশে গিয়েও কি কেউ নিশ্চিন্ত ছিলেন? সেখানেও বারবার হানাদারদের আক্রমণ দেশের সু-সন্তান (পরে সাংবিধানিক প্রথম রাষ্ট্রপতি) লন্ডনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাড়ীটি আক্রান্ত হল- মর্মান্তিকভাবে খুন করা হল আমাদের এক দাদাকে যিনি তখন ঐ বাড়িটি পাহারায় ছিলেন। অতএব শান্তিকামী আমাদের আবার যাত্রা নিরাপদ গন্তব্যে। এই ইতিহাস শুধু একটি শহর বা গ্রামের নয়- ব‘তঃ সমস্ত দেশেরই যে সম্বন্ধে বহু সচিত্র গ্রন্থাদি প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে- ভবিষ্যতেও হবে। দেশে এবং বিদেশেও। একাত্তরের এই মহাবিপর্যয়ের পর স্বভাবতই দেশবাসী মনে করেছিল দেশের মহান সন্তানগণ জাতিকে কবির সোনার বাংলা উপহার দেবেন- শস্যে সম্পদে- ব্যবসায়-বাণিজ্য-শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে- নদীমাতৃক-সুজলা-সুফলা বাংলা হবে বিশ্বনন্দিত এক দেশ যে দেশের গুণী সন্তানগণ অর্জন করতে পারেন নোবেল পুরস্কারের মত বিশ্বনন্দিত সম্মান। যে দেশ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে হবে দিনে দিনে বিশ্ববরেণ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই দেশের- আমরা কি ভুলতে পারি বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার হত্যার কথা? কি দেখছি আজ? ক্ষমতা লাভের জন্য পরবর্তীতে পথে পথে মানুষ হত্যা- নির্বাচনের মহান দায়িত্ব ভুলে হরতাল, অবরোধ দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি- দ্রব্য ও খাদ্য সামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি একটি সম্ভাবনাময় দেশকে আরেকটি দুর্ভিক্ষের দিকে টেনে নেয়া এক ভিক্ষুকের দেশে পরিণত করা। দেশের অসহায় নির্দোষ জনতা মুখ বুজে তা শুধু কি দেখেই যাবে? প্রতিকারহীন বিচার বিবেচনাহীন? এই একবিংশ শতকে? এই বিশ্বের বহু দেশে যুগে যুগে আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইন্দোনেশিয়া এমনকি আফ্রিকাতেও সেদিন কিন্তু জনতা ফুঁসে উঠে ভেঙ্গে দিয়েছে অসৎ ক্ষমতালোভীদের বিষদাঁত। আমাদের স্বাধীনতা সংগীতেও আছেঃ তোমার বিচার করবে যারা। আজ জেগেছে সেই জনতা।
তাই দেশবাসীর তরফ থেকে আমরা বলি সকল ক্ষমতার লোভ- বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে দেশের উন্নয়ন, শান্তি, শিক্ষা ও সমৃদ্ধির স্বার্থে আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা নিন- দেশের জনতা আজ সবাই বুঝতে পারে- কারা দেশের শত্রম্ন অথবা মিত্র- সব ক্ষেত্র বুঝেই তারা তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন- গলাবাজি, ভয়-ভীতি দর্শন, মানুষ হত্যা, সমাবেশের নামে দেশের সম্ভাবনাময় শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে কোনই ফল হবে না।
জাগ্রত জনতা আজ চায় ফুলে-ফসলে পূর্ণ স্বনির্ভর একটি দেশ যেখানে মানুষ নিশ্চিন্ত জীবন-যাপন করবে- সন্তানগণ পাবে উচ্চশিক্ষা- মাতৃস্বরূপা নারীগণ হবে না আর নির্যাতিতা- নারীগণ শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজ উন্নয়ন ও চাকরি-বাকরিতে পাবে সমঅধিকার ও পার্লামেন্টেও থাকবে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব। দেশ আজ চায় সেই জননায়ক- সেই জনপ্রতিনিধিদের যাদের নিরলস শ্রমে দেশ ভরে উঠবে শস্যভাণ্ডারে, বৃক্ষ সম্পদে, নব নব শিল্পের উন্নয়নে ও প্রসারে, গৃহপালিত জীবজন্তুর শতভাগ প্রসার ও উৎপাদনে- যারা দূর করবে দেশের দারিদ্র্য- যারা দেশবাসীকে সঙ্গে করে লক্ষ্য প্রাণের মহান মিলনেঃ গ্যারিএল্ড, আব্রাহাম লিংকনের মত উঠো- জাগো-দেশকে বাঁচাও- মানুষকে বাঁচাও।
**************************
ড· আশরাফ সিদ্দিকী
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০০৮