না, দেশপ্রেম নিহত হয়নি; তবে বেশ আহত হয়েছে যে সেটা ঠিক। যে জন্য কাতর অবস্থায় পড়ে আছে। কাতরাবে যে এমন জোরও পাচ্ছে না, নিজের মধ্যে। সেবাশুশ্রূষার লোক নেই। তা কার হাতে আহত হলো আমাদের ওই অতিজীবন্ত দেশপ্রেম? অতিজীবন্তই তো ছিল সে এতদিন, বিশেষ করে একাত্তরে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা বারবার বিদ্রোহ করেছি, ব্রিটিশ আমলে যেমন পাকিস্তান আমলেও তেমনি। বিদ্রোহ যে করেছি সেটা ওই দেশপ্রেমের কারণেই। অনেককাল ধরেই সমষ্টিগতভাবে বাঙালী রাষ্ট্রদ্রোহী, কিন্তু কখনোই দেশদ্রোহী ছিল না।

দেশ বলতে কেবল ভূমি বোঝায় না; ভূমি তো বোঝাবেই, কিন্তু দেশ ভূমির চেয়েও বড়, অনেক অনেক বড়। কেননা দেশে মানুষ আছে, মানুষ থাকে এবং সে জন্যই দেশ অমন তাৎপর্যপূর্ণ। দেশপ্রেম বলতে আসলে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসাই বোঝায়।

আমাদের এই দেশপ্রেম বারবার পরীক্ষা ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে। একাত্তরের কথা আমরা ঘুরে ঘুরে বলি, কেননা চরম একটা পরীক্ষা তখনই হয়েছে। তার আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে, কিন্তু একাত্তরে যেমনটা হয়েছে বাঙালীর জন্য দেশপ্রেমের পরীক্ষা তেমনটি আর কখনো হয়নি। হানাদারেরা সকর দেশপ্রেমিক মানুষকেই সেদিন প্রাণদণ্ডাদেশ দিয়েছিল, অপেক্ষাটা ছিল আদেশ কার্যকর করবার মাত্র। স্বাধীনতার পরে দক্ষিণপন্থী একটি বাংলা দৈনিক লিখেছিল-কমিউনিস্টদেরকে আণ্ডাবাচ্চাসমেত খুঁজে বের করতে হবে; একাত্তর সালে চরম দক্ষিণপন্থী পাকিস্তানী সেনাবাহিনী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শিশু-বৃদ্ধ সব দেশপ্রেমিকেরই খোঁজ করছিল, কুকুরের মতো, গন্ধ শুঁকে শুঁকে। সন্দেহভাজন যাকেই পেয়েছে হত্যা করেছে। কিন্তু ওই চরম নির্যাতনেও দেশপ্রেম নিহত হয়নি। নিহত হবে কী, উল্টো শক্তিশালী হয়েছে, অগ্নিপরীক্ষিত ইস্পাতের মতো। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বহু মানুষ সেদিন ‘পাাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে সম্মত হয়নি, বরঞ্চ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে দিতে বুক পেতে দিয়েছে, গুলিতে নিহত হবার জন্য।

অমনভাবে পরীক্ষিত যে দেশ্রপ্রেম, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুগের পর যুগ ধরে যে যে লড়ছিল, স্বাধীনতার পরে এখন দেখছি তার ভীষণ দুর্দশা। স্বাধীনতার পর ক্রমাগত আঘাত পেয়েছে, পেয়ে পেয়ে এখন বেশ কাতর হয়ে পড়ে রয়েছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, একটি লক্ষ্য ধরে এগুচ্ছিল, লক্ষ্যে পৌঁছে দেখে সে আক্রান্ত, বিপদগ্রস্ত। এর অর্থ কী? স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে তাই কি দেশপ্রেমের এই নিবীর্য অবস্থা? মোটেই তা নয়। ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তি তো অনেক দূরের কথা, সে তো সহজে আসে না, আসার পরেও বোঝায় যায় যে আসেনি, এমনকি স্বাধীনতাও আসেনি। এসেছে যা তা হলো অল্প কিছু লোকের পক্ষে স্বৈরাচারী হবার সুযোগ। এরাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখেছে, কখনো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, কখনো বা সরাসরি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে। এরাই বড় বড় আমলা, খুব বড় ব্যবসায়ী, কেউ বা মোল্লা, ফতোয়া দেয়, কেউ সরকার-সমর্থিত ষণ্ডা, ছিনতাই করে, ধর্ষণও করে থাকে। এরা অপচয় করে, পাচার করে দেয় সম্পদ। দেশকে উৎপাদনকারী হতে দেয় না, করে রাখে ব্যবসা নির্ভর, যাতে তাদের সুবিধা হয়; কমিশন পায়। স্বাধীনতা এদেরই। আর এই স্বাধীনতার হাতেই দেশপ্রেম আহত হয়েছে। নিহত যে হয়নি, সেটা আমাদের কপালের জোর।

এইসব বিলাসী ও উচ্ছৃঙ্খল ক্ষমতাধররা সবাই আত্মপ্রেমিক, এদের মধ্যে দেশপ্রেমের নামগন্ধ নেই। ইতিহাসের মস্ত বড় পরিহাস এটা যে, পরাধীনতার কালে আমরা দেশপ্রেমিক ছিলাম, স্বাধীনতার পর উপক্রম হলো তাকে হারাবার। অনেক কাল আমরা পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশের দুই শ’ বছর, পাকিস্তানের চব্বিশ বছর; সেই দীর্ঘ সময় ধরে স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হবো, আশা ছিল, ছিল ভরসা; স্বাধীনতার পর দেখা গেল মার খেয়েছে দেশপ্রেম স্বয়ং।

দেশপ্রেম এবং আত্মপ্রেম পরস্পর বিরুদ্ধ বটে। কিন্তু প্রকৃত ও আলোকিত দেশপ্রেমের সঙ্গে আত্মপ্রেমের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী নয়। কেননা ব্যক্তির মুক্তি তো আসলে সমষ্টির মুক্তির মধ্যেই নিহিত। একা কোন মানুষটা কবে স্বাধীন হয়েছে? দ্বীপে যে থাকে, অথবা বনবাসে, তার তুলনায় পরাধীন আবার কে? দেবতা ও পশুর কথা আলাদা, স্বাভাবিক মানুষ স্বাধীন হয় সমাজের ভেতরে থেকেই। এবং সমাজ যদি নষ্ট হয়, তবে ব্যক্তি কি করে স্বাধীন হবে? যে পুকুরের পানি গেছে পচে, সেখানে কোন মাছটা নিরাপদ শুনি? যে আত্মপ্রেমের চর্চা চলছে আজ বাংলাদেশে, তাতে ভবিষ্যতে এদেশ মনুষ্য বসবাসের যোগ্য রইবে এমনটা ভরসা করা সহজ নয়। সত্যি কঠিন।

পরাধীনতার যুগে আমরা রাষ্ট্রর বিরুদ্ধে লড়েছি। ব্রিটিশের রাষ্ট্র আমাদের শত্রম্ন ছিল, পাকিস্তানী রাষ্ট্রও আমাদের শত্রম্ন ছিল, কিন্তু বাংলাদেশী রাষ্ট্র? সেও কি শত্রম্ন? শত্রম্ন না হোক, এ রাষ্ট্র জনগণকে স্বাধীনতা দিচ্ছে না এটা ঠিক। এ রাষ্ট্রের কর্তারা স্বাধীনভাবে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। এই নির্মম সত্যটাকে তো সাধারণ মানুষকে দিন দিন ক্ষণে ক্ষণে প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে বৈরি রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল মুসলিম লীগ, বিপক্ষে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই রাষ্ট্রের পক্ষে, অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পক্ষে। জনগণের পক্ষে কেউ নেই। না, নেই। জনগণের জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা ডাক দেবে দেশপ্রেমের নামে, বলবে রাষ্ট্রের এই পুরাতন স্বভাব বলবৎ রাখবার জন্য আমরা লড়িনি; একে বদলানো চাই, বদলাতে হবে।

পাকিস্তানের পক্ষে লোকে একদিন জিন্দাবাদ দিয়েছিল, নইলে সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো কী করে? সেদিন বিপক্ষে ছিল কংগ্রেস, পক্ষে মুসলিম লীগ। লোকে ভাবল পাকিস্তান এলে তাদের জন্য স্বাধীনতা আসবে। পাকিস্তানের পক্ষে তাই ভোট পড়েছিল শতকরা ৯৭টি। সেই ভোট দেশপ্রেমের। কিন্তু দেখা গেল যে, নতুন রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে না, স্বাধীনতা চলে গেল অল্পকিছু লোকের হাতে। সাত বছর পার হতে না হতেই, ১৯৫৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের মানুষ আরো বর্ধিত হারে, এবার শতকরা ৯৮ জনই ভোট দিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিদার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। এ ভোটও দেশপ্রেমিক ভোটই। তারপরে, বাংলাদেশে ভোট হয়েছে, কিন্তু স্রোতের মতো মানুষ যে একদিকে এগোবে সেটা ঘটেনি। কেননা কোনো দলকেই মানুষ প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক মনে করেনি, মনে করেছে তারা ক্ষমতার জন্য লড়ছে। কামড়া-কামড়িই করছে, বলতে গেলে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দু’টি ঘটনা একই সঙ্গে এবং ক্রমাগত বর্ধিত মাত্রায় ঘটেছে। প্রথমটি হলো দেশপ্রেমের পতন, অপরটি বৈষম্যের বৃদ্ধি। এদেরকে আলাদা আলাদা ব্যাপার মনে হবে; কিন্তু আসলে এরা একই বিকাশের দু’টি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। আর সেই বিকাশটা হলো পুঁজিবাদের। পুঁজিবাদ ছাড়া যে বিকল্প নেই এবং ওটিই যে সবচেয়ে ভালো আদর্শ এই বোধ ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর ছিল; পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের নায়কেরাও এই আদর্শেই দীক্ষিত ছিলেন। ফলে পুঁজিবাদই কায়েম হয়েছে। আর পুঁজিবাদের নিয়মই তো এটা যে, সেটি বৈষম্য বৃদ্ধি করবে; ধনীকে আরো ধনী এবং গরিবকে আরো গরিব করে ছাড়বে। সেটাই ঘটেছে; স্বাধীনতা চলে গেছে ধনীদের হাতে, গরিব হয়েছে বঞ্চিত মানুষ। আর ধনী যারা তারা তো আসলে দেশপ্রেমিক নয়, তারা অত্যন্ত স্থূল ও কদর্যরূপে আত্মপ্রেমিক বটে।

দেশপ্রেম থাকা না থাকার বাস্তবতাটা বেশ পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ে যদি শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই। সেখানে ভবিষ্যতের নাগরিকেরা সব প্র‘ত হচ্ছে, আড়মোড়া ভেঙে। যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, তারা তো স্বদেশপ্রেমের চর্চা করবার জন্য মোটেই অঙ্গীকারাবদ্ধ নয়। অনেক টাকা বিনিয়োগ করছে, সেই টাকা তুলে নেবে, মুনাফা করবে। মুনাফার এই নগদ লোভটা যে দেশপ্রেমের পৃষ্ঠপোষক নয় সে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। যারা মাদ্রাসায় পড়ছে তারাও দেশের কথাকে অগ্রাধিকার দেবে না, অন্ন চিন্তাকেই প্রধান করবে; এবং পরবর্তীতে যেহেতু তাদের অধিকাংশই জীবন-সংগ্রামে পরাভূত হবে তাই ধরে নিলে খুবই ভুল করা হবে যে, দেশের জনগণের প্রতি ভালোবাসা তাদের মধ্যে উথলে পড়বে। মূলধারা বাংলা মাধ্যমেরই; কিন্তু সেখানেও ভেজাল খুব বেশি; আর ভেজাল জিনিস কখনোই দেশপ্রেমের মতো খাঁটি ব‘কে উৎসাহিত করতে পারবে না, পারাটা তার স্বভাববিরুদ্ধ।

পুঁজিবাদ যে দেশপ্রেমবিরোধী এটা স্বতঃসিদ্ধ। বাংলাদেশ ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি প্রান্তিক রাষ্ট্র। এর পক্ষে স্বাধীন হওয়া একটি কল্পকাহিনীতে পর্যবসিত হবে বলে আশঙ্কা। কেননা বাংলাদেশকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে; যে নির্ভরশীলতা মোটেই কমছে না, বরঞ্চ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, ক্রমাগত।

২·

এই যে দেশপ্রেমের বিপুল প্রবাহকে রক্ষা করতে আমাদের ব্যর্থতা, এর জন্য দায়ী কে? এক কথায় বলতে গেলে দায়ী হচ্ছে নেতৃত্ব। নেতৃত্বকে আমরা দোষী করছি আমাদের নিজেদের দায়িত্ব এড়াবার জন্য নয়, করছি নেতারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে।

বার বার দেশপ্রেমিক আন্দোলন হয়েছে আমাদের দেশে। সবক’টিই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, অর্থাৎ অসংগঠিত, সুসংগঠিত নয়। সামনে নেতারা ছিলেন, কিন্তু তাঁরা সংগঠন গড়ে তুলতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, সেটাই আসলে প্রধান দুর্বলতা, নেতারা জানতেন না কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা লড়ছেন। স্পষ্ট ধারণা ছিল না। হয়তো অস্পষ্ট একটা স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তা কী করে অর্জন করতে হবে জানা ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বপ্নটাও ছিল অনুপস্থিত। ছিল কেবল একটি নেতিবাচক ধারণা। হটাবার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন, কিন্তু গড়বার ব্যাপারে ছিলেন না।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথাই ধরা যাক। সেতো এক বিরাট বড় ঘটনা, তার তাৎপর্যও বিপুল। কিন্তু সে আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না বললেই চলে। বরঞ্চ বলা যায় যে, জাতীয় যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যাঁরা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছিলেন, তাঁরা প্রত্যাখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির সকালেই। তাঁদের সিদ্ধান্ত ছিল ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা অমান্য না করার। ছাত্ররা তাদের সে নির্দেশ মানেনি, তারা এগিয়ে গেছে, প্রাণ দিয়েছে এবং আন্দোলনে অভূতপূর্ব ব্যাপকতা নিয়ে এসেছে। বাইশে ফেব্রুয়ারি গায়েবী জানাজা ছিল। একুশের আন্দোলনে জাতীয় পর্যায়ের সংগ্রাম পরিষদ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি; বাইশ তারিখে গায়েবি জানাজার যে আহ্বান সেটিও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিই জানিয়েছে। জানাজা হবে সকালবেলা, মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে। সকাল হয়েছে, সময় এগিয়ে যাচ্ছে,

কিন্তু জমায়েত দেখা যাচ্ছে না। অল্পকিছু ছাত্র উপস্থিত। অবাক কাণ্ড ঘটল কিছুটা পরে। গর্জন শোনা গেল জনতার। দেখা গেল সচিবালয়ের দিক থেকে হাজার হাজার সরকারী কর্মচারি আসছে জানাজায় যোগ দিতে। মিছিল ক্রমেই বড় হয়েছে। আরো মানুষ এসেছে। জানাজা শেষে আবার মিছিল বের হয়েছে। তাতে ছোট ছোট মিছিল যুক্ত হয়েছে। পুলিশ গুলি ছুঁড়েছে। মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা আবার যোগ দিয়েছে। সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মতিন মিছিলেই ছিলেন। কিন্তু তার কমিটি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল না। আবদুল মতিন বরঞ্চ পরে বলেছেন, তখন তার মনে হয়েছিল যে, ‘এই মিছিল কোথায় যাচ্ছে তা আমরা জানি না।’

এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। এক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, অন্য নেতৃত্ব আসে, কিন্তু নতুন নেতৃত্বও বলতে পারে না কোথায় যেতে হবে, লক্ষ্যটা কী? বায়ান্নর পর চুয়ান্নতে নির্বাচন হয়েছে। লক্ষ্য কী? লক্ষ্য ছিল লীগকে হটিয়ে লীগ-বিরোধী যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় বসবে। লীগ হটে গেল। কিন্তু ক্ষমতালোভীরা ঐক্যবদ্ধ রইল না, তারা ভাগ হয়ে ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দিল। ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানেও একই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। জনগণ সামরিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তারপরে কী করতে হবে, কোন দিকে এগোতে হবে তার জন্য কোনো পরিচালিকা সংগঠন কিংবা নেতৃত্ব ছিল না। ছয় দফা আন্দোলনের সময় নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের, কিন্তু ছয় দফা দেওয়া হয়েছিল পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে, স্বাধীনতার কথা ছয় দফাপন্থীরা কেউ তখন বলেনি। একাত্তরেও বলত না, যদি সামরিক শাসকেরা ছয় দফার ভিত্তিতে একটি সংবিধান রচনার উদ্যোগ নিত। আপসের পথে ওরা যায়নি, বরঞ্চ বাঙালী হত্যায় নেমেছে, যে জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছিল একাত্তরের যুদ্ধ।

যুদ্ধ শুরুর আগে সাতই মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তৃতাটি দেন সেটি অসাধারণ, তাঁর দেওয়া বক্তৃতার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, নিঃসন্দেহে। এতে তিনি চুয়ান্নর নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেছেন, বলেছেন, ‘১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি।’ এ বড় সত্য কথা, একাধিক অর্থে। প্রথমত, গদিতে বসাই ছিল নেতৃত্বের লক্ষ্য, তারচেয়ে বেশি কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, গদিতে বসতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন, যদিও কেন হয়েছেন তার কারণ উল্লেখ করেননি, ওই মুহূর্তে সেটা প্রাসঙ্গিকও ছিল না। বক্তৃতার এই কথাটা বলা হয়েছিল যে, চুয়ান্নতে যেমন আমাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে, আশংকা হচ্ছে এবারও তাই করা হবে। তবে এবার জনগণ তা মেনে নেবে না। নেবে না যে তার লক্ষণ ও প্রমাণ সারা বাংলাদেশ জুড়ে তখন দৃশ্যমান। শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে ওই বক্তৃতা দিচ্ছিলেন সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিও একই কথা বলছিল। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় মুক্তির কথা বলেছেন, স্বাধীনতার কথা বলেছেন। অমন বক্তব্য অমনভাবে আগে কখনো আসেনি। কিন্তু তিনি আবার সমঝোতার পথও খোলা রেখেছিলেন; যে পথে তারা আসবে বলে ইয়াহিয়া ও তার জল্লাদেরা পরে ভান করেছিল, চূড়ান্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে। মুজিব বলেছিলেন তিনি যদি হুকুম দিতে নাও পারেন তবুও জনগণের কাছে অনুরোধ রইল, ‘‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবেলা করো।” কিন্তু কীভাবে? শত্রম্নর আছে বিমান বাহিনী, ট্যাঙ্ক বাহিনী, আছে কামান, মর্টার, রকেট-লঞ্চার, জনগণের আছে কী? দা, কোদাল, কিংবা গাদা বন্দুক ছাড়া? তা দিয়ে কীভাবে লড়াই হবে? পথ-নির্দেশ ছিল না, শুধু অনুরোধ ছিল। জনগণ যুদ্ধ করেছে ঠিকই, তবে আবারও সেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। আওয়ামী লীগের নেতারা জানতেন না কী করতে হবে, দিশেহারা হয়ে তাঁরা শহর ছেড়েছেন, সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গেছেন; সেখানে গিয়েও যে তারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন তা নয়, নানারকম বিরোধে লিপ্ত ছিলেন। সকল মুক্তিযুদ্ধেরেই একটা প্র‘তি থাকে, সংগঠিত নেতৃত্ব থাকে, থাকে আন্তর্জাতিক সমর্থন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এসব কিছুই ছিল না। তবু জনগণ লড়েছে এবং বিজয়ী হয়েছে।

জয়ের পর নেতারা ভাবলেন জয়টা তাঁদেরই। একাত্তরে যারা দিশেহারা হয়েছিলেন বিপদের আকস্মিকতায়, বছর না গুরতে তাদেরকেই দেখা গেল দ্বিতীয়বার বেসামাল হয়েছেন-বিজয়ের আকস্মিকতায়। কী করবে ভেবে উঠতে না পেরে তারা হাতের কাছে যা যা পেল দখল করতে শুরু করে দিল। ওটিই হয়ে দাঁড়াল আদর্শ। পাকিস্তানী হানাদারেরা লুটপাট করেছে,ম কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল; এখন যখন দেখা গেল যে, যুদ্ধজয়ী বীরেরা নিজেরাই ওই একই কাজ করছে তখন প্রতিরোধ করবে কে, কার ঘাড়ে কতটা মাথা? প্রতিরোধ সম্ভব ছিল না। তাই দেখা দিল হত্যাকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসন, সামরিক অভ্যুত্থান। এসব কোনো ঘটনাই মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি করল না, উল্টো বরঞ্চ দেশপ্রেমকে আঘাত করতে থাকল, ক্রমাগত।

একাত্তরে বাঙালীর রণধ্বনি ছিল, ‘জয় বাংলা’। ওই ধ্বনি এখন সর্বজনীনতা পেয়েছিল যে হানাদার বাহিনীর একজন কর্মকর্তা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, তার তিন বছরের কন্যাটিও ওই ধ্বনি দিয়ে ছোটাছুটি করত। অথচস পরে ওই ধ্বনি খোদ বাঙালীদের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। আসার কারণ ব্যর্থতার বোধ। বাঙালী পরিচয় একাত্তরে যে সম্মান বয়ে আনতো পরে তা মলিন হয়ে এসেছে-ধারাবাহিকভাবে।

নেতৃত্বের ব্যর্থতার কতা বলছিলাম। নেতৃত্ব কেবল যে ব্যর্থ হয়েছে তা তো নয়, জুলুমও করেছে। একটি ছোট ঘটনার উল্লেখ করা যায়, যেটি নেতৃত্বের চরিত্রকে ধরিয়ে দেয়। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এ একটি দৃশ্য ধরা পড়েছে। এক যুবক খাঁচায় করে একটি টিয়া পাখি নিয়ে যাচ্ছে এবং পাখিটিকে বলছে, ‘বল, জয় বাংলা বল’। অবিকল হানাদার বাহিনীর মতো আচরণ, যারা আটকে পড়া বাঙালীদের বলত, ‘বল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বল’। পাখি বহনকারী ওই যুবকটি নেতা ছিল কিনা জানি না, কিন্তু তার মধ্যে বিলক্ষণ নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল।

৩·

দেশপ্রেমের বিপক্ষেও বক্তব্য রয়েছে। পৃথিবীতে ধর্মের নামে অনেক অনাচার হয়েছে, নরহত্যা ঘটেছে, তারপরেই বোধহয় দেশপ্রেমের স্থান; ওই বোধও কিছু কম রক্তপাত ঘটায়নি। হিটলার-মুসেলিনির কাহিনী গালগল্প নয়। অত্যন্ত বাস্তব ও রূঢ় সত্য। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেশপ্রেমকে অতিউচ্চে তুলে এবং তার সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সৃষ্টিতে ব্যস্ত রয়েছেন। দেশের বাইরে তো অবশ্যই দেশের ভেতরেও। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রনায়কেরা দেশের স্বাধনিতার কতা তুলে নাগরিকদের অধিকার হরণ করে থাকে, এটা বেশ সহজ ও কার্যকর উপায় বটে। অর্থাৎ অন্যদেশের সম্পদ লুণ্ঠন তো বটেই নিজের দেশের মানুষদের স্বাধীনতা হরণের জন্যও দেশপ্রেমকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

কিন্তু এসব হচ্ছে দেশপ্রেমের বিকৃতি। যথার্থ দেশপ্রেম দেশের মানুষকে ভালোবাসে; এবং অন্ধ হয় না। এই দেশপ্রেমকে গণতান্ত্রিক হতে হয়। অর্থাৎ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সে অস্বীকার করে না বরঞ্চ তাকে স্বীকার করে নিয়ে, এবং রক্ষা করবার প্রয়োজনেই নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এই দেশপ্রেম আত্মরক্ষামূলক, অন্যদেশকে আক্রমণের কথা সে ভাবে না, নিজের জন্য দাঁড়াবার একটা জায়গা খোঁজে। দেশের মানুষের মধ্যে ভালোবাসার যে আবেগ ও অনুভূতি থাকে সেটাই হচ্ছে দাঁড়াবার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান।

এই যে স্থানটির কথা ভাবছি এতে মাতৃভাষার অবস্থান একেবারে প্রাথমিক। মানুষের সংস্কৃতি নানা উপাদান দিয়ে গড়া, সব উপাদানই জরুরী, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর যেটি সে হচ্ছে ভাষা। আমাদের জন্যে এটা একটা বড় রকমের গৌরবের ব্যাপার এই যে, আমরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আন্দোলন করেছি এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ওই আন্দোলনের ভূমিকা গৌণ নয়, মুখ্য। আমাদের ওই আন্দোলন সারা বিশ্বের প্রর্শংসা অর্জন করেছে; শুধু তাই নয়, আসলে দৃষ্টান্ত হিসেবেই গৃহীত হয়েছে। দেশে দেশে এখন নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার চেষ্টা চলছে। বিশ্বায়নের মারাত্মক আগ্রাসনের মুখে বিপন্ন-বিপর্যস্ত সংস্কৃতিগুলো মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে আত্মরক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। মাতৃভাষা হচ্ছে শিক্ষার শ্রেষ্ঠ বাহন এবং আত্মপরিচয়ের প্রধান অবলম্বন।

দেশপ্রেম মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে সংগঠিত হলে তারচেয়ে ভালো কিছু হয় না। আমাদের বেলাতে যেটা ঘটবার চমৎকার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেটা ঘটল না, নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। বিশ্বাসঘাতকতার প্রধান দিকটা হচ্ছে দেশের স্বার্থের তুলনায় নিজের স্বার্থকে বড় করে তোলা। দিক আরো একটি আছে, সেটা হলো রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা। বড় দু’দল সোৎসাহে এবং প্রায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে ওই কাজটি করছে, যেমনভাবে পাকিস্তানী শাসকেরা একদিন করেছিল। পাকিস্তানীদের ওই তৎপরতার বিরুদ্ধে সেদিন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়েছিলাম, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে সেখানে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। ওই আন্দোলনের কারণেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর পেছন দরজা দিয়ে ধর্মকে আবার ফেরত নিয়ে আসা হয়েছে রাজনীতিতে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ক্ষুন্ন করার এ চেষ্টা অপ্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু বাস্তবে ওই চেষ্টা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, হ্রাস না পেয়ে।

যে দেশপ্রেম গণতন্ত্রকে সঙ্গে নেয় তার চরিত্রটা হলো মায়ের মতো, স্নেহ ও মমতায় ভরপুর। উল্টোদিকে, আগ্রাসী ও ফ্যাসিবাদী দেশপ্রেম হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক। মাতৃভাষা মায়ের সঙ্গে জড়িত। একাত্তরে দেশপ্রেমিক বাঙালীর জন্য প্রধান সত্য হয়ে উঠেছিল মেয়েদের ওপর অত্যাচার। এককভাবে অন্য কোনো ঘটনা দেশে-বিদেশে বাঙালীকে এতটা আতঙ্কিত ও প্রতিরোধব্যাকুল করেনি নারী নির্যাতন যেমনটি করেছিল। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুজবিনগরে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের কার্যকর কমিটির একটি সভা হয়, সেই সভাতে তখনকার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ হানাদার বাহিনীর বর্বরতার ছবি তুলে ধরতে গিয়ে নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। বলেছেন, নাৎসিরা গ্যাস চেম্বারে পুরে মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, কিন্তু হানাদার পাকিস্তানীরা তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাজউদ্দিনের ভাষায় “মাতৃ জাতির ওপর পাশবিক অত্যাচার করে পরে তারা আমার মায়ের জাতিকে গাছে বেঁধে উলঙ্গ করে লজ্জাস্থানে শ্যুটিং করেছে। এর প্রতিশোধ বাংলার প্রত্যেকটি সুসন্তানকে নিতে হবে। আমার এই মায়ের জাতিকে সম্মানের আসনে ফিরিয়ে নিতে হবে। যত দিন পর্যন্ত আমরা তা পারব না, ততদিন পর্যন্ত আমরা ক্ষান্ত হবো না, ততদিন পর্যন্ত আমরা মায়ের সুসন্তান বলে দাবি করব না’ (উদ্ধৃত আবদুল আজিজ বাগমার, ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন, উন্মেষ ও অর্জন’, পৃ· ২২০)। আওয়ামী লীগের একাংশ তখন আপোসের কথা ভাবছিল, তাদের কাছেও এই আবেদন কার্যকর হয়ে থাকবে, অল্প করে হলেও।

মূল কথাটা এটাই যে, দুর্দশা দেখে যদি হতাশ না হতে চাই, যদি আত্মসমর্পণে সম্মত না হতে চাই এবং এগিয়ে যেতে না চাই অধঃপতনের দিকে তাহলে দেশপ্রেমকে অবশ্যই পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য ওটিই প্রশস্ত পথ। কিন্তু দেশপ্রেম ফিরে আসবে না যদি আমরা পুঁজিবাদিী আদর্শে আমাদের অত্যন্ত পুরাতন দীক্ষাকে প্রত্যাখ্যান না করতে পারি। আমাদের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের সামনে পুঁজিবাদী বিকাশের কোনো বিকল্প কখনো ছিল না;

একাত্তরে তাদের একাংশ সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেসব ছিল কথার কথা মাত্র, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তাদের পক্ষে তাই দেশপ্রেমিক থাকাও সম্ভব হয়নি, তারা হাত লাগিয়েছেন নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করবার মনমাতানো কাজে। তাদের সেই তৎপরতার হাতে দেশপ্রেম বিলক্ষণ জব্দ হয়েছে।

দেশপ্রেম নিয়েই দাঁড়াতে হবে। কিন্তু দেশপ্রেমকে যেন পর্যাপ্ত মনে না করি। কেমন ধরনের দেশপ্রেম চাই সেই প্রশ্নটি তো সঙ্গে সঙ্গেই আসবে। প্রয়োজন সেই দেশপ্রেম যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলবার লক্ষ্যে কাজ করবে। আর গণতন্ত্র বলতে বুঝব নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন এবং সর্বোপরি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি।

জোয়ার যেটি এসেছিল সেটা এখন স্তিমিত বটে, কিন্তু তাকে আবার সতেজ করা সম্ভব। তার জন্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার হবে। বড় দু’দলের নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই পরীক্ষিত হয়ে গেছে, এবং নেতারা পরীক্ষায় বেশ ভালোভাবেই ফেল করেছেন। ভরসা নতুন নেতৃত্বের ওপরই, যে নেতৃত্ব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে। ওই আন্দোলন এগিয়ে গেলে বড় দু’দল থেকে মানুষ সরে আসবে। ঢাকার ওসমানী উদ্যান রক্ষার জন্য একদা একটা আন্দোলন হয়েছিল; সে আন্দোলনকে নিয়ে তখনকার সরকার হাস্যকৌতুক করেছে এবং মনে হয়েছে যে, যেকোনো মূল্যেই হোক ঢাকা শহরের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ওই খোলা জায়গাটিকে ধ্বংস না করে তারা ছাড়বে না। আন্দোলনটি বড় ছিল না, কিন্তু তার পেছনে জনসমর্থন ছিল প্রচণ্ড, যেটা টের পেয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে, ন্যাম সম্মেলনের ভবন তারা অন্যত্র নির্মাণ করেছে। ইতিহাসের পরিহাস এই যে, ন্যাম সম্মেলন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। আরো বড় পরিহাসমূলক ঘটনা ঘটে গেছে; তৎকালীন সরকার এখন বিরোধী দলে এবং তারা অন্যত্র স্থান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ওই উদ্যানকেই তাদের প্রতীক অনশনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। উদ্যানটি না থাকলে তারা আজ কোথায় অনশন করতেন? ব্যাপারটা প্রতীকের মতো। দেশ না থাকলে দেশের নেতারা থাকবেন কোথায়, তা দেশকে রক্ষা করতে তারা চেষ্টা করুন কিংবা নাই করুন। বাংলাদেশের নতুন সরকার ঠিক করেছে মাটির তলের গ্যাস ও তেল যেখানে আছে সেখানে রাখবে না, বিদেশীদের কাছে বিক্রি করে দেবে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আন্দোলনটা ফাজলামি ছাড়া আর কিছু না; আরেকজন বলেছেন, আন্দোলনকারীরা গ্যাস-তেল সম্বন্ধে কিছু জানে না; এদের দু’জনের কেউই কিন্তু বৈজ্ঞানিক নন, উভয়েই হিসাব-বিজ্ঞানী। আমরা নিশ্চিত যে একদিন এরাও বুঝবেন যে, আন্দোলনকারীরাই দেশকে রক্ষা করেছে, নইলে বাংলাদেশ আরেকটি নাইজেরিয়া হবার দিকে দ্রুত এগিয়ে যেত।

দেশকে বাঁচাতে হবে, নইলে আমরা বাঁচব কী করে, তা ব্যক্তিগতভাবে আমরা যত বড়ই হই না কেন। দেশ না থাকলে বড় মানুষদেরকে যে বিদেশীরা বড় মনে করবে এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই।

প্লাবন একটা চলছে। সেটি সন্ত্রাস, দূর্নীতি ও হতাশার। মানুষের জীবনে নিরাপত্তা কমেছে। টাকার শাসন এখন অপ্রতিরোধ্য। যে কিশোর একদিন অন্যের বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতো; তার চোখে স্বপ্ন এখন একটাই, দ্রুত বড়লোক হবার। এই লোভের তাড়নাতে তারা যা দিছু করতে পারে। ক’দিন আগে কয়েকজন কিশোর টাকার দুরন্ত লোভে তাদেরই পরিচিত একজন স্কুল ছাত্রকে যেভাবে প্রথমে হত্যা এবং পরে টুকরো টুকরো করে কেটেছে সেই কাজটাই নানা মাত্রায় ও উপায়ে সামাজের সর্বত্র চলছে। মায়া মমতা চলে গেছে, ভয়ও নেই। অন্যদিকে লোকে এসব দেখে ও শুনে আতঙ্কিত ও ক্রুদ্ধ হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সংগঠিত কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারছে না। সকলেই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে।

অপরাধ দমনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের; রাষ্ট্র সে-দায়িত্ব পালনে অপারগ। তাতেই বোঝা যায় এ-রাষ্ট্র কাদের দখলে রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের অনেকেই অপরাধ দেখলে চিন্তিত না হয়ে উৎফুল্ল হয়, অপরাধীদের কাছ থেকে বখরা পাবে এই আশাতে।

প্লাবণটা পুঁজিবাদের। এই পুঁজিবাদ উৎপাদন, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এসবে বিশ্বাস করে না; বিম্বাস করে লুণ্ঠনে। লুণ্ঠনের প্রয়োজনে যা যা করা দরকার সবই করে, আপনজনকে হত্যা করাসহ। হাত কাঁপে না। এর বিরুদ্ধে বিপরীত প্লাবন চাই। স্বতঃস্ফূর্ত নয়, সুসংগঠিত। দেশপ্রেমিক আন্দোলন আবশ্যক; যে-আন্দোলন অন্ধ হবে না, জানবে যে তার লক্ষ্য হচ্ছে এই রাষ্ট্র ও সমাজকে গণতান্ত্রিক করা। এই আন্দোলন ছাড়া দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তা আমরা যতই কাদুনি গাই না কেন, কিংবা প্রকাশ করি না কেন ক্রোধ। এ কোনো নতুন আন্দোলন নয়, এটা ছিল, তাকে বেগবান ও গভীর করা প্রয়োজন, সংঘবদ্ধ হয়ে। এছাড়া দেশ বাঁচবে না, অর্থাৎ আমরা কেউই বাঁচব না।

**************************
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০০৮