National Events - http://events.amardesh.com
অল্পকথায় ভাষা আন্দোলন, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে
http://events.amardesh.com/articles/106/1/aaaaaaaa-aaaa-aaaaaaaa-aaaaaaaa-aaaaaaa-aaaaaaaaaa-/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 02/29/2008
 

একুশের আন্দোলনের উত্তাল সময়েও নিউইয়র্ক টাইমস-এর কোনো সাংবাদিক ঢাকায় ছিলেন না। রাজনৈতিকভাবে শহরটি তখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাস্তায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের খবরটি পত্রিকায় ছাপা হয় বটে, তাতে তেমন গুরুত্ব ছিল না। ২২ ফেব্রুয়ারি কলকাতা থেকে নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে দায়সারা গোছের খবরে বলা হয়, বাংলাকে সরকারি ভাষা করা হোক-এ দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি করেছে। এর ফলে ছয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।


অল্পকথায় ভাষা আন্দোলন, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে

একুশের আন্দোলনের উত্তাল সময়েও নিউইয়র্ক টাইমস-এর কোনো সাংবাদিক ঢাকায় ছিলেন না। রাজনৈতিকভাবে শহরটি তখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাস্তায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের খবরটি পত্রিকায় ছাপা হয় বটে, তাতে তেমন গুরুত্ব ছিল না। ২২ ফেব্রুয়ারি কলকাতা থেকে নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে দায়সারা গোছের খবরে বলা হয়, বাংলাকে সরকারি ভাষা করা হোক-এ দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি করেছে। এর ফলে ছয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।

দুই দিন পর, ২৪ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি অধিকতর বিস্তৃত একটি প্রতিবেদন ছাপে করাচির নিজস্ব প্রতিবেদকের বরাত দিয়ে। বলা হয়, সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে আরও পাঁচজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। পরপর দুই দিনের সংঘর্ষে মোট নিহতের সংখ্যা আট বলে জানায় পত্রিকাটি।

দ্বিতীয় প্রতিবেদনেও বিক্ষোভের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা অনুল্লিখিত। পত্রিকাটি জানায়, আগের দিন ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে, ফলে সেখান থেকে কোনো খবর পাঠানো যাচ্ছে না-এ কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, খুব দ্রুত এক বিবরণীতে এ সংঘর্ষের পটভূমি ব্যাখ্যা করা হবে।

বাংলা ভাষার বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, টাইমস যে সম্যক উপলব্ধি করেনি তার একটি সম্ভাব্য কারণ, যে প্রতিবেদনগুলো পত্রিকায় এ সময় ছাপা হয় তার প্রদায়ক ছিলেন উদুêভাষী পাকিস্তানি সাংবাদিক (বা স্ট্রিঙ্গার)। ভাষাকে ঘিরে ঢাকায় বাঙালিদের মধ্যে রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বাঁধছে, সে কথা আদৌ উল্লেখ না করে সেই প্রদায়ক ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিরোধের কারণ বলে ব্যাখ্যা করেন। প্রতিবেদক জানান, পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে তার সূত্রপাত আগের সপ্তাহে সেখানকার প্রধান দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার নিষিদ্ধ করা থেকে। সে পত্রিকায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধের একটি আক্রমণাত্মক সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল। টাইমস জানায়, ‘পত্রিকাটি মর্নিং নিউজ পত্রিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।’ নাজিমুদ্দিনের শ্যালক খাজা নুরুদ্দিন সে সময় মর্নিং নিউজ-এর মালিক। পত্রিকাটি জানায়, গতকাল (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকায় একদল বিক্ষোভকারী মর্নিং নিউজ পত্রিকার অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে।

একই প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়, ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হোক-এ দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। করাচিতে পাকিস্তান সরকার এমন দাবি বরাবর প্রত্যাখান করেছে। কারণ ক্ষমতাসীনদের ভয়, এর ফলে করাচি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ শিথিল হয়ে আসবে। পত্রিকাটি জানায়, “সাধারণভাবে সবাই এ কথা স্বীকার করেন যে, পাকিস্তানবিরোধী বিভিন্ন মহল (‘নন-পাকিস্তানি এলিমেন্টস’) ভাষার প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সময়ের ক্ষতিকর বিক্ষোভ আয়োজনে ব্যবহার করছে।” অন্য কথায়, পূর্ব পাকিস্তানে যারা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করছিলেন, টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, তাঁরা সবাই পাকিস্তানবিরোধী মহল এবং যে বিক্ষোভ চলছে তা পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকর।

ভাষার প্রশ্নটি যে পাকিস্তানের উভয় প্রদেশের রাজনীতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সে কথা বুঝতে টাইমস-এর অবশ্য বিলম্ব হয়নি। পরবর্তী দুই বছর ভাষাসহ বিভিন্ন প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বৈরিতার কারণে সেখানে একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। এ আন্দোলনের পরিণতিতেই ’৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে শাসক মুসলিম লিগের ভরাডুবি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী যুক্তফ্রন্টের বিজয় ঘটে। ওই বছর ২৩ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, যুক্তফ্রন্টের হাতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা দল মুসলিম লিগের পরাজয়ের প্রধান কারণ ভাষাগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের প্রতিবাদ। নির্বাচনী ভরাডুবির পরিপ্রেক্ষিতেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ এ সময় বাংলাকে দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় ভাষা করা যাবে কি না তা বিবেচনার জন্য জাতীয় আইন পরিষদের একটি কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করে।

এ কমিটি গঠন প্রসঙ্গেই টাইমস তার ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনে একটি স্বল্প পরিচিত ঘটনার প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পত্রিকাটি জানায়, করাচিতে হাজার হাজার পাকিস্তানি বিক্ষোভকারী দেশের জাতীয় আইন পরিষদের ভেতর ঢুকে বাংলাকে দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা করার যেকোনো প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, উদুêই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল হক নামের ৮২ বছর বয়স্ক এক মোল্লা। জনাব হক তাঁর সমগ্র জীবন উর্দু ভাষার প্রচার ও প্রসারে ব্যাপৃত-এ কথা জানিয়ে পত্রিকাটি জানায়, করাচির উদুê কলেজের ছাত্ররা, যারা বাংলাবিরোধী বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়, শহরের দোকানিদের তাদের আন্দোলনের সর্মথনে দোকানপাট বন্ধ রাখার দাবি জানায়।

ঠিক ১৫ দিন পর, ৭ মে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি জানায়। সে ঘটনা পর্যাপ্ত গুরুত্বের সঙ্গেই টাইমস-এর পাতায় স্থান পায়। সিদ্ধান্তটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নাগরিকদের একটি বিজয় সূচিত হলো। এ বিজয়ের ফলে পাকিস্তানের অন্য ভাষাভাষী মানুষের ভেতর তাদের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির দাবি উঠবে এমন একটি ইঙ্গিতও সেখানে করা হয়। পাকিস্তান আইন পরিষদে বাংলাকে স্বীকৃতি জানিয়ে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়, টাইমস তার প্রধান ধারাগুলো এভাবে তুলে ধরেঃ (পাকিস্তান) প্রজাতন্ত্রের সরকারি ভাষা হবে উর্দু ও ইংরেজি। রাষ্ট্রপ্রধান সিদ্ধান্ত নিলে অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষাও অনুরূপ মর্যাদা পাবে। আইন পরিষদের সদস্যেরা উদুê, বাংলা বা ইংরেজিতে বক্তব্য পেশ করতে পারবেন। এই আইন কার্যকর হওয়ার সময় থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ইংরেজি সব সরকারি কাজে ব্যবহৃত হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে আরবি, উদুê ও বাংলা পাঠদানের ব্যবস্থা করা হবে। এ আইন কার্যকর হওয়ার ২০ বছর পরও ইংরেজি ব্যবহার সিদ্ধকরণে আইন পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে।

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, নিউইয়র্ক

**************************
হাসান ফেরদৌস
দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৮