আমি এর সঙ্গে যোগ করতে চাই- অন্যায়, অবিচার, স্বৈরাচার, নারী নির্যাতন, অসহায়দের নির্যাতন, স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধীঃ কোন অপশক্তির কাছেই ‘মাথা নত না করা’।
আমরা জানি এই মহান ভাষা আন্দোলন ও একুশকে ভিত্তি করেই গর্জে উঠেছিল ’৫২-তে সারাদেশ এবং তারপরেই ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারীদের কবল থেকে ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতা-মহান স্বাধীনতা যে ইতিহাস- বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
আমি এর সঙ্গে যোগ করতে চাই- অন্যায়, অবিচার, স্বৈরাচার, নারী নির্যাতন, অসহায়দের নির্যাতন, স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধীঃ কোন অপশক্তির কাছেই ‘মাথা নত না করা’।
আমরা জানি এই মহান ভাষা আন্দোলন ও একুশকে ভিত্তি করেই গর্জে উঠেছিল ’৫২-তে সারাদেশ এবং তারপরেই ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারীদের কবল থেকে ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতা-মহান স্বাধীনতা যে ইতিহাস- বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
বাংলা ভাষা আজ ইউনেসকোর প্রস্তাব মতে বিশ্বের অন্যান্য বন্ধু দেশেও স্বীকৃত-এ গৌরব কি আমাদের জন্য কম প্রাপ্তি? এই ভাষার সম্মানের জন্যই (অথবা একুশের জন্যই) আমাদের বাংলাদেশ আজ বহির্বিশ্বে অধিক পরিচিত-অন্ততঃ বহুবার বিদেশে গিয়ে যা শুনেছি। এবং বাংলাদেশের এই অর্জনের আদর্শ বহু দেশ আজ তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায় করে চলেছেন (ইরান, ইরাক, তুরস্ক, আফ্রিকা, শ্রীলংকা, সুদান, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া-যদিও অন্য ভাষাও তারা শিখছেন)। এইসব দেশ শুধু ভাষা নয়-ঐতিহ্য, স্বনির্ভরতা, স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষা ও সোচ্চার। বহু দেশ তাই তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য-সঙ্গীত, শিল্প, লোকসাহিত্য-ঐতিহ্য বলতে যা বোঝায় সবকিছু রক্ষায়ই তৎপর-প্রতিষ্ঠা করে চলেছে ঐতিহ্য রক্ষার জাদুঘর, গ্রন্থাগার।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতার অর্থই হলো দেশকে কবির সোনার বাংলায় পরিণত করা-আধুনিক বৈজ্ঞানিক পন্থায়-অধিক ফসল উৎপাদন-ফলে-ফসলে দেশকে স্বনির্ভর করা-যা আমি বিশ্বের বহু দেশেই দেখেছি। একটি উদাহরণ দিই-আপনারা যারা ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণ করেছেন-দেখেছেন গৃহে গৃহে উদ্যানে এবং পথের দু’পাশে কি চমৎকার ফলদ এবং অন্যান্য বৃক্ষের সমাহার। এই ত মাত্র ক’বছর পূর্বে ‘ফোবানার’ (নিউইয়র্ক) সাহিত্য সম্মেলন শেষে নিউইয়র্ক থেকে চললাম কানাডার মনট্রিয়েল- রাস্তার দু’পাশে সে যে কি বৃক্ষশোভার ‘আসুন আসুন’ অভিনন্দন। আমেরিকায় ডক্টরেট করতে গিয়ে (১৯৬৩-৬৬) বহু স্থানে ভ্রমণে গিয়ে সর্বত্রই দেখেছি পরিবেশ রক্ষার বিপুল আয়োজন-এমনকি ফ্রান্স, ইটালী, ইংল্যান্ড এবং অন্যত্রও। মরুদেশ মধ্যপ্রাচ্যও আজ বৃক্ষসম্ভারে মরূদ্যান হয়ে উঠেছে-যা আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রায় প্রতিদিনই দেখছি। আমাদের দেশেও বৃক্ষরোপণ দিবস পালিত হচ্ছে-কারণ প্রকৃতিতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেড়ে গেলে দেশে হবে শস্যনাশ-অকাল বন্যা ও সিডরের মত ভয়াবহ অবস্থা-যে জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দাঁড়াতে হয় দেশ-বিদেশে। গৃহে গৃহে রাস্তার দু’পাশে আমরা যদি বিভিন্ন বৃক্ষ লাগাই তবে দেশের প্রকৃতিতে ভারসাম্য আসবে-ফলে-ফসলে ভরে উঠবে দেশ। আমরা কি বাঁচতে চাই, না মরতে চাই? ‘একুশে’ কি আমাদেরকে সাহিত্য-সম্পদে বাঁচার শিক্ষাও দেয় নাই?
আমাদের হাজার বছরের যে ঐতিহ্য-সঙ্গীত-শিল্প-প্রাচীন সাহিত্য-সেত আমারই ঐতিহ্য-এই একুশের মহান দিবসে তাকে কি আমরা বাঁচিয়ে রাখার প্রতীজ্ঞা গ্রহণ করবো না?
আমরা পত্রিকা খুলতেই দেখতে পাই-আমাদের মাতৃভাষার মতই উজ্জ্বল-প্রোজ্বল-মা-বোনদের প্রতি বিরূপ অবিচার-অত্যাচার হচ্ছে। এসিডে ঝলসে দেয়া হচ্ছে মায়েদের মুখ। তাই একুশের পবিত্র দিনগুলিতে আমাদের প্রতীজ্ঞা হওয়া উচিত- আমরা ঘরে ঘরে মাতৃজাতিকে সুশিক্ষিত করে তুলবো-উচ্চশিক্ষায় অগ্রণী হয়ে সরকারি-বেসরকারি সব বিভাগেই তারা উপযুক্তভাবে সম্মানিত হবেন-ঘরে মায়েরা যদি শিক্ষিত হন তবে তাদের সন্তানেরাও অবশ্যই শিক্ষিত হবে-তারা মূল্য দেবে দেশের স্বাধীনতা-একুশে-স্বনির্ভরতার মহান ঐতিহ্য গড়ে উঠতে- দেশে থাকবে না মানুষ হত্যা-অত্যাচার-অবিচার।
একুশের আদর্শে আমরা বাড়াতে চাই সাক্ষরতার হার- গড়তে চাই আদর্শ গৃহ ও সমাজ-দূর করতে চাই সর্বপ্রকার অবিচার-রাজনৈতিক সহিসংতা-নারী নির্যাতন-দরিদ্রের প্রতি অত্যাচার-অবিচার। মোট কথা-আমার ভাষাকে ভালোবেসে আমরা প্রতিবছরই শুধু ঢাকায় নয়-জেলা-উপজেলা এবং গ্রামের যে কোন পাঠাগারেও করবো বইমেলা। গ্রামাঞ্চলের গৃহে গৃহে গড়ে তুলবো পারিবারিক গ্রন্থাগার, অন্ততঃ একটি আলমারিতে-যা পাঠ করে বাড়ীর শিশু-কিশোর-মা-বোনেরা এবং গৃহবাসী সবাই মনুষত্বের পথে-মহত্ত্বের পথে অগ্রসর হতে পারে। এ দায়িত্ব নিতে হবে গৃহকর্তা-শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী-দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ এবং দেশের বিত্তশালী সকলকেই-অন্ততঃ যারা দেশকে ভালোবাসেন- দেশের মঙ্গল চান। আমাদের দেশটি দরিদ্র হলেও এখানেই জন্মেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, বিদ্রোহী কবি নজরুল এবং নোবেল বিজয়ী দেশের বরেণ্য সন্তানগণ।
আমাদের আছে সবই-স্বাধীনতা-উৎসব ও একুশের পবিত্র দিনগুলিতে শুধু প্রতীজ্ঞা নেয়া-আমরা বাঁচতে চাই-বিশ্বের অন্যান্য স্বনির্ভর দেশের মত সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই-ভিক্ষার ঝুলি নয়-একুশের মহান ঐতিহ্যের সম্মান নিয়ে-বলতে চাইঃ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি- আমি কি ভুলিতে পারি’।
**************************
ডঃ আশ্রাফ সিদ্দিকী
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮