- Home
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- একুশে ও আমাদের সংস্কৃতি
একুশে ও আমাদের সংস্কৃতি
- By National Days
- Published 02/26/2008
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- Unrated
একটি মানবগোষ্ঠী তার উদ্ভবকাল থেকে যত দিন পর্যন্ত সে টিকে থাকছে তত দিন যাপিত গোষ্ঠীজীবনে অসংখ্য ব‘-উপাদান ও মনন-কল্পনাজাত ভাব-উপাদানের সম্মিলনে নিজের সংস্কৃতি নির্মাণ করে তোলে। জীবন যেহেতু তৈরি হয় স্থান, কাল ও পাত্রের চালচিত্রে তাই জীবন এক জায়গায় থেমে থাকে না, সমাজের মানুষ জ্ঞাতসারে কি অজ্ঞাতে পাল্টাতে পাল্টাতেই এগিয়ে যায়। কালস্রোতে মানুষের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হয়, সামাজিক আচরণ ও অভ্যাসে ভিন্নতা আসে, শিল্পের সাধনায় বৈচিত্র্য দেখা দেয়, মোড় বদল ঘটে। খাদ্যের অভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বা‘নির্মাণ, ভাষা, ধর্ম, সামাজিক সংস্কার, এমনকি কুসংস্কার এবং মনের গড়ন ও কল্পনার ধাঁচ- সবই একটি জাতির সাংস্কৃতিক উপাদান। জীবনকে বাদ দিয়ে তাই সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই। জীবন পাল্টে যেতে থাকলে সে-কারণে সংস্কৃতির রূপও অন্য রকম হতে থাকে। আর জীবন পাল্টায় ঘটনার অভিঘাতে। ব্যক্তিমানুষের জীবন ও গোষ্ঠীজীবন উভয়তেই।
আজ যে ভূখণ্ডকে আমরা রাজনৈতিকভাবে ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়েছি বিগত অর্ধশতকে (১৯৪৭-৯৭) তার ভৌগোলিক সীমানা অপরিবর্তিত থাকলেও সমাজ ও জনজীবন অনড় থাকেনি। এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে সুদূর অতীত থেকে সর্বদাই বিপর্যস্ত হয়েছেঃ নদী ভেঙেছে, ঘর-বাড়ি-গ্রাম তলিয়ে গেছে, নদীর বুকে চর জেগেছে, সেখানে মানুষ বসত করেছে। স্বাভাবিক তরঙ্গহীন স্থিতাবস্থা ব্যাহত হওয়ার অসহায়ত্ব ও আততি র্(ণভ্রধমভ)-কে মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে, এবং তার প্রক্রিয়ায় মানব সম্পর্কে ও গোষ্ঠীজীবন-বিন্যাসে যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয় তার প্রভাব বাংলার মানুষের প্রকৃতি ও আচরণকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে। পরবর্তী সময়ে বিপর্যয়ের অন্তত একটি কারণ বেড়েছে, তা হল রাজনৈতিক দুর্বিপাক। এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার হাল ধরে আছে রাজনীতি, ব্রিটিশ আমল থেকেই। পরিবর্তনের একটি বড়ো ঢেউ আঘাত করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন দিয়ে, সে আঘাত সামলে ওঠা গিয়েছিল; তখন জীবন ও সংসার এলোমেলো হয়নি, এলোমেলো হয়েছিল আকাঙক্ষা ও স্বপ্ন, তাও জোড়া লেগেছিল বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায়। তার পরের আঘাতের তীব্রতা ভয়াবহঃ ১৯৪৭-এর দেশভাগ। পূর্ব বাংলার জনবিন্যাস, অর্থনীতি, মানুষের মূল্যবোধ, নিরাপত্তা সমস্ত কিছু ওলোটপালোট হয়ে গেল। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের বিপুলভাবে দেশত্যাগ, একভাষী ও একসংস্কৃতির এক দেশে বিভাষী ও দূরসংস্কৃতির একটি জনগোষ্ঠীর আগমন, ভাষিক ও ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ওপর ধর্মীয় সংস্কৃতির বাঁধনের প্রবল চাপ ইত্যাদি ’৪৭-পূর্ব যুগ থেকে অন্য একটা যুগে হ্যাঁচকা টানে নিয়ে গিয়েছিল এই দেশকে। সাতচল্লিশের অভিঘাত এত গভীর ও দূরযানী যে আণবিক বিস্ফোরণের শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার ন্যায় ঐ বঙ্গভঙ্গের প্রভাব এখনো আমাদের, এদেশের বাঙালির জাতীয় জীবনে ভাগ্যলিপির ন্যায় অদৃশ্য নিয়ামক শক্তি। আমাদের সামাজিক ইতিহাসে ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৭৫ একেকটি অবিস্মরণীয় সময়চিহ্ন, যেমন সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৭৫৭ সাল একটি বিভাজন-রেখা। এইসব বৎসরে এমন কিছু রাজনৈতিক ঘটনার সূত্রপাত আমরা দেখতে পাই যা সমাজের গতিধারাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তার সার্বিক ফলাফলের শুভত্ব বা সর্বনাশ বিচারের অপেক্ষা প্রধান যা বিবেচ্য তা হলঃ এসব ঘটনায় সমাজ তার স্বাভাবিক পুরনো চালে-ছন্দে-বিশ্বাসে আর চলতে পারেনি, প্রবল ঘূর্ণিস্রোত সমাজ ও মানুষের যাবতীয় ব‘জাগতিক ও মননকেন্দ্রিক অবস্থানকে স্থানচ্যুত করেছে। এখানকার সমাজের সামন্ততান্ত্রিক স্তরবিন্যাসে অর্থনৈতিক ও বৃত্তিভিত্তিক সংস্কৃতির বিভিন্নতা চিরকালই ছিল। কিন্তু সেই বিভিন্নতায় কোনো প্রতিযোগিতা বা সংক্ষোভ থাকত না। সাতচল্লিশেই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের স্রোতে সমাজবিন্যাসে এমন অস্থিরতা এল এবং ধনসঞ্চয় ও শক্তিবলয়ের গণ্ডি এত দ্রুত সম্প্রসারিত হল যে, ন্যায়বুদ্ধি ও বিবেক সঞ্জাত স্থির মূল্যবোধগুলো কোনোভাবেই আর ক্রিয়াশীল থাকতে পারল না। মূল্যবোধের ধস নামার সেই যে শুরু হয়েছিল অদ্যাবধি তা পতনশীলই, শুধু মাঝে-মধ্যে কোনো বিশেষ কার্যকারণের সম্মিলনে ইতিহাস-তৈরি-করা ঘটনায় সে-অধঃপতন সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, যেমন ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন, কি ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান কিংবা ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এইসব ইতিবাচক চৈতন্যজাগর ঘটনা যেভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হওয়া প্রত্যাশিত ছিল তা হয়নি মূলত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে নানাবিধ চক্রান্তের কারণে। সমাজের স্বাভাবিক গতি বারংবার এভাবে অবরুদ্ধ হওয়ায় তার চলন বঙ্কিম হয়েছে, ঋজু, সরল বেগবান হতে পারেনি। জনগণের আত্মত্যাগ ও সাহস বিভিন্ন সময়ে ব্যর্থ হওয়ায় সে উপহাসিত হয়েছে, তার স্বপ্ন ও বাসনার অপমৃত্যু ঘটায় সে ক্রমাম্বয়ে অবিশ্বাসী, চতুর ও স্বার্থপর হয়েছে অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে। এই জটিল পথপরিক্রমার ক্ষত তার সাংস্কৃতিক অবয়বে স্থায়ী দাগ রেখেছে, নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য পরম্পরা ও গতিপথ তার মননে ও চিন্তায় ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সেই অস্বচ্ছতার রন্ধ্রপথে বেনো জল হিসেবে এসে ঢুকেছে বাইরের সংস্কৃতির নানা জঞ্জাল। কোনো সংস্কৃতিই স্থবির নয় এবং সংস্কৃতিসাংকর্য কাম্য ও প্রত্যাশিত-এ সত্য মান্য করার পরেও নিজের ওপরে অন্যের প্রভাব বা অভিঘাতের শুভাশুভতা নির্ণয় সব সময়েই জরুরি; কারণ জীবদেহের ন্যায় সংস্কৃতিও কখনো এমন কিছু গ্রহণ করতে চায় না যা তার পক্ষে আত্তীকরণ করা সম্ভব নয়। অডিওভিজুয়াল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের যুগে পৃথিবী ক্রমে এক অবিভাজ্য ও অখণ্ড সংস্কৃতি নির্মাণে নিরন্তর ক্রিয়াশীল বটে, কিন্তু তার ফলে দরিদ্র ও অবহেলিত তৃতীয় বিশ্বের নিজস্ব সংস্কৃতি যে ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নত ধনী দেশের সমাজজীবন ও সংস্কৃতির চাপে মৃত্যুপ্রহর গুণছে, তা কল্যাণকর ও কাম্য কিনা সে সম্পর্কে চিন্তা করা অনিবার্য হয়ে দেখা দেওয়া উচিত। বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও বৈশ্বিক মননের পূর্বশর্ত যেমন নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যজ্ঞান লুপ্ত করে দেওয়া হতে পারে না, তেমনই বিভিন্ন অসবর্ণ সংস্কৃতির অসম, প্রতিকূল ও পরস্পরবিরোধী উপাদানের সম্মিলনে তৈরি করা কোনো নতুন সংস্কৃতি ধারণাও হতে পারে না। সংস্কৃতিকে তৈরি ‘হয়ে-উঠতে’ হয়, তাকে তৈরি ‘করতে গেলে’ সৃষ্টির জায়গায় অনাসৃষ্টি ঘটে।
যখন এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পাকিস্তান চেয়েছিল, তার পিছনে যে-আকাঙক্ষা কাজ করেছিল তা অধিক মাত্রায় ধার্মিক হওয়া নয়। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করায় তার সায় ছিল কেবল একটি কারণেই, তা এই যেঃ এই বিভাজনে সে তার প্রবল প্রতিপক্ষ উন্নত সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে হটিয়ে দিয়ে সুষম প্রতিযোগিতায় নেমে নিজের উন্নতির চেষ্টা করতে পারবে। এই অপবুদ্ধির কারণ নূøনতম আয়াসে কার্যসিদ্ধির বাসনা; সংখ্যা গুরু হয়েও শিক্ষায়, মেধাচর্চায় ও রুচিতে বলশালী সংখ্যালঘুর সঙ্গে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সে জয়ী হওয়া বা সমকক্ষ হওয়া অসম্ভব ভেবেছিল। বাঙালি হিন্দুর মতো বাঙালি মুসলমানও ঐতিহ্যিকভাবে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে নিয়ে কখনো বাঁচতে শেখেনি, কারণ ঐতিহাসিকভাবেই উভয় সম্প্রদায়ের কারোরই মনের গড়ন ধর্মকেন্দ্রিক নয়। ফলে, দ্বিজাতি-তত্ত্বের রাজনীতিতে এদেশের মানুষ ধর্মের আশ্রয়ে পারলৌকিকতা খোঁজে নি, বরং ধর্মের বাতাবরণে নিজেদের ইহলৌকিক উন্নতি ও নিরাপত্তা নিরঙ্কুশ করতে চেয়েছিল। সে যেমন নতুন করে মুসলমান হতেও চায়নি, তেমনি নতুন করে বাঙালি হতেও চায় নি। কারণ সে জানত, সে মুসলমানও বটে আবার বাঙালিও বটে। তবে এটুকুমাত্র বলা যায় যে, বাঙালি হওয়া বা না-হওয়া নিয়ে তার আদৌ কোনো ভাবনা ছিল না। অবশ্য মুসলমান হওয়াতে শুধু মুসলমানদের একটা দেশে পেয়ে গেলে তার সমূহ লাভ, কারণ অমুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বীরা তখন দেশ ছাড়া হয়ে যাবে, অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সে রেহাই পাবে- এই জাগতিক কাণ্ডজ্ঞান তার বেশ প্রবল ছিল। তখনও তার ধারণায় আসে নি যে বাঙালি অমুসলিমদের দেশ ছাড়া করলেও অবাঙালি মুসলিমও তার প্রতিপক্ষ হিসেবে এসে হাজির হতে পারে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন সম্পূর্ণতই অবাঙালিদের হাতে ছিল। জনসংখ্যার আধিক্য গ্রাহ্যে আনলে পাকিস্তানের রাজধানী সঙ্গতভাবে ঢাকা শহরেরই হওয়ার কথা, তবু করাচি হওয়াতে তার দুঃখ ছিল না। কারণ এ প্রসঙ্গটি তার ভাবনার বিষয়ই হয়নি। ‘লড় কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ জবানটিও তো বাংলা ভাষা ছিল না, জিন্না-লিয়াকত-নাজিমুদ্দিন উর্দুতে কথা বললে বলুন, আমাদের কী-মনোভাব অনেকটাই এরকমের যেন। নিজের মনের ভিতরে এ-জাতীয় উপলব্ধির ফলেই সম্ভবত এমন সহনশীলতা এসেছিল যে, আন্দোলনে নেতৃত্ব ওরাই যখন দিয়েছে তখন ওদের পছন্দের জায়গাতেই
রাজধানী করুক না-হয়, আমরা আমাদের মতো নির্বিঘ্নে থাকি, নিজস্ব চালে চলি। বোঝাই যায়- আমাদের ধর্মও তো তোমাদের মতো ইসলাম, উপরন্তু আমরা সংখ্যায় বেশি, অতএব রাজধানীটি আমাদের চাই- এমন ন্যায়যুক্তি নিয়েও কলহ করার কথা ভাবেনি। অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমান তার মুসলমানত্বের অভিমান সম্বন্ধে কোনো চেতনার প্রকাশ ঘটায়নি সেদিন। অথচ মুসলিমলীগের পাকিস্তান তৈরির দাবিকে সে সমর্থন করেছিল। ব‘তপক্ষে ধর্মীয় সংস্কৃতি রক্ষার জেহাদে সমগ্র পাকিস্তানি যুগে এদেশের বাঙালি মুসলমান কখনো অবতীর্ণ হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানে কাদিয়ানী নিপীড়ন নিয়েও সে একপ্রকার অসাড়তার পরিচয় দিয়েছিল- আনন্দ-উল্লাস বা প্রতিবাদ কিছুতেই সে মুখর হয়নি।
এসব বাহ্যলক্ষণ থেকে সিদ্ধান্তে আসতেই হয় যে, পাকিস্তানের সৃষ্টি মুহূর্তে বা তার পরেও পূর্ব-বাংলার মুসলমান প্রকৃতিগতভাবে যে-সংস্কৃতিক আচরণ ও ক্রিয়াকলাপে স্থিত ছিল তা ভাষাভিত্তিক ও জীবনচর্চাশ্রয়ী ঐতিহ্যনির্ভর একটি সংস্কৃতি-যাকে সনাক্ত করা যায় ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে।
সমাজের অগ্রসর ও ধীমান্ একটি স্তর ব্যতিরেকে অনগ্রসর জনসাধারণের ধারণায় ও বোধে কোনো সংস্কৃতি চিন্তার উপস্থিতি ছিল না। যাপিত জীবনের দৈনন্দিন তুচ্ছতায় তারা স্বার্থলোভে দুর্বল প্রতিবেশীকে আঘাত করেছে, সেই প্রতিবেশীর ধর্মীয় পরিচয় তাকে বাঁচায়নি; তবে ভাগ্যদোষে হিন্দুরা যেহেতু রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়েছিল তাই তারা স্বাভাবতই ছিল বেশি দুর্বল ও বিপদগ্রস্ত। ব্যাপারটি যদিও কাকতালীয়, তবু সংখ্যাগুরু মুসলমান সমাজ তার হ্নদয়হীন নিষ্ঠুরতা ও নির্লজ্জ বলদর্পিতার দায় ও অভিযোগ এড়াতে পারে না। কিন্তু এই জাগতিক স্বার্থান্ধ বিষয়বুদ্ধির সঙ্গে তার সংস্কৃতিচিন্তাপ্রসূত কোনো অনুকূল বা প্রতিকূল উপলব্ধি কার্যকর ছিল না।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি এবং তার জন্য আন্দোলন সর্বপ্রথম প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় সংস্কৃতি বাঙালি মুসলমানের কাছে নিতান্তই গৌণ ব্যাপার। মুখ্য যে নয়, তাও হয়তো সে ততক্ষণ বোঝেনি যতক্ষণ-না তার সঙ্গে সংঘাত লাগল ভাষা ও জীবনাচারনির্ভর ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির। বলা চলে, সে-ই তার প্রথম আত্মজাগরণ, নিজস্ব ঘরে ফেরার জন্য তার প্রবল অনির্বাণ তৃষ্ণা একটি সংশয়ব্যাকুল প্রশ্ন তো এতদিন পরে বর্তমানের বাস্তবতায় করাই যায়ঃ সেদিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাওয়া কি পরে ইংরেজিকে ও ইংরেজির ছত্রছায়ায় পশ্চিমকে ডেকে আনার প্রারম্ভিক ধাপ ছিল? নিরতিশয় দুঃখ ও গস্নানি থেকে উত্থিত এই হতাশাকে একপাশে সরিয়ে নির্লিপ্তভাবে বিচার করলে-এর ভিতর থেকে আমাদের মনের কাঠামো আকস্মিকভাবে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করায় যে চমকে উঠতে হয়। আমি দেখতে পাই, ১৯৫২-তে আমরা যে-কারণে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছি, আজ ঠিক সেই একই কারণে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে উদাসীন হয়েছি। কারণটি আর কিছুই নয়, ইহজাগতিক উন্নতি ও অস্তিত্ব রক্ষা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করলেও তা বাঙালির মাতৃভাষাই থাকত। তা হলে, ঢাকার রাজধানী না-হওয়ায় যেমন তার কিছুই যায়-আসেনি তেমনি বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলেও কিছু যায় আসে না- এমন ভাবনাই তো সঙ্গত ছিল। অথচ, তেমন ভাবনা সে ভাবতে পারেনি। কারণ, মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হলে একভাষী দেশে মানবসম্পদের যথাযোগ্য কাজে লাগবার যে-অবাধ সুযোগ উপস্থিত হয় তার ফলে দেশের মানুষের ইহজাগতিক ও আত্মিক বা নান্দনিক উন্নতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
আজ যদি সেই একই জাতি তার রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে ঔদাসীন্য ও নিঃসাড়তা দেখায়, তো বুঝতে হবে যে, এই সময়কালের ভিতরে এমন এক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করা হয়েছে যখন রাষ্ট্রভাষার কাছ থেকে প্রত্যাশাপূরণের কোনো সম্ভাবনা আর নেই। বলা যেতে পারত, পরিপ্রেক্ষিত ‘তৈরি হয়েছে’, তা না বলে ‘তৈরি করা হয়েছে’, বলার পশ্চাতে আমি এই বিশ্বাস ব্যক্ত করতে চাই যে, বর্তমানের এই বাস্তবতা রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতা ও চক্রান্তের ফসল। নির্বুদ্ধিতা এ-বুদ্ধিটুকুর অভাবে যে, রাষ্ট্রে মাতৃভাষার সম্মান বাধ্যতামূলক ও সর্বত্রগামিতা অনিবার্য করে না-তুলতে পারলে ‘রাষ্ট্রভাষা’ শব্দটি হাস্যকর ও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। আর চক্রান্ত এইখানে যে, বুলি হিসেবে বাংলারূপী রাষ্ট্রভাষার জয়গান যেমনই দশদিক প্রকম্পিত করুক, রাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দেশপ্রেমের ও দৈশিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সমস্ত কর্মকাণ্ড সচেতনভাবে পরিচালিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-হত্যার পর থেকে দু’দশক ধরে সমাজগতির প্রবাহ যে-খাতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে তার মধ্যে যেহেতু দেশপ্রেমের অস্তিত্ব ছিল না, স্বাভাবিকভাবেই এমন কিছু ঘটানোও তাই সম্ভব হয়নি যাতে ভাষাপ্রেমের ভিতর দিয়ে সংস্কৃতিচেতনা পল্লবিত ও সংহত হতে পারে। নিজের দেশের বাইরে সর্বস্থানে সবই সর্বোত্তম-এমন ধারণা যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিপোষকতায় ব্যাপ্ত হতে থাকে এবং স্বদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও শিক্ষাব্যবস্থায় ঐ চিন্তার বীজ রোপণ করে দেয়া হয় তা হলে সমাজমানসে ও সংস্কৃতিচর্চায় চিন্তার যে-বিপর্যয় ও দিগ্ভ্রম ঘটতে বাধ্য বর্তমানে সেটাই ঘটছে। আত্মজাগরণের বোধ প্রথম যদি অঙ্কুরিত করে থাকে বাহান্নর একুশে, তো আজকের বিস্মরণের কুয়াশাও সেই একুশেই সরাবে, এই ভরসাটুকু তার কাছে চাওয়া যায়।
বিগত পঞ্চাশ বছরে আমাদের সংস্কৃতির মুখচ্ছবি যতখানি পরিবর্তিত হয়েছে তার জন্য প্রায় সর্বাংশে দায়ী শেষার্ধভাগ অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমাদের সংস্কৃতির উপর বিদেশি নয়, পশ্চিম পাকিস্তানী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন টেকানোর জন্য নানা কৌশলে যুদ্ধ করতে হয়। শত্রম্নপক্ষের আগ্রাসনের ধরন ভাষা, বর্ণমালা, রবীন্দ্রনাথ, ইসলামীকরণ ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গকে ঘিরে বারে বারে উদয় হয়েছে এবং যখন যে-পদ্ধতিতে প্রয়োজন সেভাবেই তা প্রতিহত করা হয়েছে। আমাদের ঐতিহ্যচেতনা আমাদের ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে সর্বদাই স্মরণে রাখতে হয়েছিল আত্মত্রাণের জন্য। ইউরো-মার্কিন সংস্কৃতির অভিঘাত সীমাবদ্ধ ছিল সাহিত্য-শিল্প ও মননচর্চার জগতে। অন্য সংস্কৃতির লৌকিক সংসারের প্রত্যক্ষ চিত্র মগজে আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ তখন ছিল না। প্রযুক্তি ও কৌশলগত পশ্চাৎপদতার কারণে বাংলার জনজীবনে যে-সমাজকাঠামো ছিল সেখানে সংস্কৃতির কিছু সূচক (ধভঢণস) ছিল, যেমন বিভিন্ন গ্রামীণ ক্রীড়া-উৎসব, পাঠাগার, তরুণের গণ-শরীরচর্চা, বিনোদনের জন্য ক্লাব বা সংঘের পৌরোহিত্যে নাটক, যাত্রা, লোকসঙ্গীতের আসর ইত্যাদি অনুষ্ঠান ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা যেমন রক্ষা করত তেমনি গোপন ফল্পুধারায় দেশপ্রেমের জমি তৈরি করত মনের গহিনে। এই জমির একটি অংশে একুশে ফেব্রুয়ারির আদর্শিকতা আত্মত্যাগের মহান ফসল ফলাত। এই যৌথ জীবনের আকাঙক্ষা ও স্বপ্নের মহিমা চূড়ান্ত রূপ নেয় আমাদের পবিত্র মুক্তিযুদ্ধে।দেশপ্রেমের জ্বলন্ত বিশ্বাস যুদ্ধজয়ের পরেও আলো ছড়িয়েছিল বেশ কিছু কাল। কিন্তু ভুল পদক্ষেপে, উদ্ভ্রান্ত পরিকল্পনায় ও রাজনৈতিক দর্শনের অভাবে সমগ্র জাতির আত্মত্যাগ বীরত্ব ও দুঃখদাহ সইবার অসামান্য গৌরব এত অপমানিত হল যে, সদ্যসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ যেমন স্বপ্নবৎ মনে হতে লাগল তেমনি অর্জিত স্বাধীনতাও নিরর্থক ও নির্বুদ্ধিতা বলে প্রতিভাত হল। সমগ্র বিষয়টি মর্মান্তিক এবং যে-দেশে এমনটি ঘটা সম্ভম তার মতো দুর্ভাগা ও অভিশপ্ত জাতি মনে হয় আর হয় না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যা প্রমান করে দিল যে, ’৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর থেকে ’৭৫-এর ১৫ই আগষ্ট পর্যন্ত এদেশ যত কিছু ঘটেছে তার পশ্চাতে রেখে দেওয়া কোনো নীল নক্শা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনা-ব্যবস্থায় তাঁর অনভিজ্ঞতাজাত ত্রম্নটি যেমনই থাকুক-না কেন, তাঁর দেশপ্রেমে কোনো খাদ ছিল না। তাঁর বিরোধানের পর থেকে কিঞ্চিদাধিক দু’ দশক দেশ যেভাবে পরিচালিত হয়েছে তাতে প্রাথমিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় সুকৃতি ক্রমাম্বয়ে লাঞ্ছিত পদদলিত ও অবলুপ্ত হয়েছে এবং সমগ্র জাতির হ্নদয়াবেগ ও মননশক্তির নৈতিক ভিত্তিভূমি বিপর্যস্ত করা হয়েছে। দেশপ্রেম নামে চেতনাগত কোনো অনুভব নিয়েই স্বাধীন দেশের মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়- এই মূল্যবোধকে পঙ্গু করতে করতে মুমূর্ষêু করে ফেলা হল।
অমর একুশের মৃত্যু আমাদের অজ্ঞাতসারে কবেই ঘটে গেছে যেই দিন থেকে ব্রতযাপনের পবিত্র এই দিনটিকে ঘিরে আমরা কার্নিভাল উৎসবের পত্তন করেছি। সমগ্র সমাজ কীভাবে জীর্ণ হয়ে গেছে, তরুণ সমাজ কীভাবে কালিমালিপ্ত হয়েছে, বুদ্ধিজীবীগণ কতখানি সুবিধাভোগী ও আপসকামী হয়েছেন এবং রাজনীতিকেরা কত দূর শঠ, এবং প্রশাসনযন্ত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কলকজা কী অপরিমেয় দুর্নীতিপরায়ণ ও নির্বিবেক তা এদেশের মানুষ কেন, অবোধ পশুপ্রাণও জানে।
কিন্তু এত বৈকল্যের পরেও আশা মরে না। যে অলৌকিক চেতনা পয়তাল্লিশ বৎসর পূর্বে এক জনগোষ্ঠীর স্নায়ুমূলে টান দিয়েছিল সে আজ সংখ্যায় বেড়ে ত্রিগুণ হয়ে গেছে। আশা এবং ভরসা এখানেই। বাঙালির সংস্কৃতি-চেতনাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখারও তো নিশ্চয়ই কোনো নৈসর্গিক সময়সীমা থাকবে। ঘুম ভাঙানোর ঘন্টা বাজাবার দায়িত্ব ইতিহাস একুশের হাতেই রেখে দিয়েছে।
আজকের বাঙালি এই বিশ্বাসও যদি হারায়, তো তার বাঁচার কোনো পথ থাকবে না এবং তার মৃত্যুতে শোকের কান্না কাঁদবার জন্য কাউকে পাওয়া যাবে না।
**************************
হায়াৎ মামুদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮