সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংস্কার প্রায় সার্বজনীন আকুতি হয়ে উঠেছে এবং তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী নাগরিক কমই রয়েছেন। তবে এই সংস্কারসাধনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই এবং এখানে মাথা চাড়া দিয়েছে সংস্কারের আরেক অর্থ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঘোষ সংস্কারের এই অর্থ নির্দেশ করেছেন ‘আজন্ম ধারণা’, এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ধারণা, বিশ্বাস’। আমরা বর্তমান রাজনীতিক পটভূমিকায় একে বলতে পারি আজন্ম লালিত লোকবিশ্বাস বা লোকধারণা
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংস্কার প্রায় সার্বজনীন আকুতি হয়ে উঠেছে এবং তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী নাগরিক কমই রয়েছেন। তবে এই সংস্কারসাধনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই এবং এখানে মাথা চাড়া দিয়েছে সংস্কারের আরেক অর্থ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঘোষ সংস্কারের এই অর্থ নির্দেশ করেছেন ‘আজন্ম ধারণা’, এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ধারণা, বিশ্বাস’। আমরা বর্তমান রাজনীতিক পটভূমিকায় একে বলতে পারি আজন্ম লালিত লোকবিশ্বাস বা লোকধারণা
সংস্কার নিয়ে দেশজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে, সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে কাউকে কিংবা কোনো গোষ্ঠীকে, নিজেদের সংস্কারপন্থী পরিচয়ে চিহ্নিত করতেও অনেকে এগিয়ে আসছেন। আর রয়েছে অন্যতর ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী, যাদেরকে মনে করা হচ্ছে বর্তমান রাজনীতি ও শাসন কাঠামোর সংস্কারসাধনে সোৎসাহী নন, তারা সংস্কার-বিরোধী অবশ্য নন, সনাতনপন্থী বলাও সঙ্গত হবে না; কিন্তু যে সংস্কারের কথা উঠে আসছে তার বিরোধী না হলেও যেভাবে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তার সমর্থক নিশ্চিতভাবে নন। এই নিয়ে মাঠ ও মিডিয়া গরম করে রেখেছেন উভয় দলের খেলোয়াড়রা, তবে খেলার ক্ষেত্রে যা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপুল সংখ্যক মানুষ আছেন দর্শক কাতারে, খেলা তারা দেখছেন বটে তবে বিবদমান দলের একজন নন মোটেই। এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ‘সংস্কার’ কথাটা ভিন্নতর একটা অর্থ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। কী সেই অর্থ সেটা কিছুটা তলিয়ে দেখা যেতে পারে।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে ‘সংস্কার’ শব্দের সাতাশটি ভিন্ন অর্থ ও প্রয়োগ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রয়োগই প্রাচীন শাস্ত্র ও সাহিত্য-জাত, সেই অর্থ থেকে অনেক সরে এসেছে আধুনিক প্রয়োগ, আমরা সংস্কার বলতে অধুনা যা বোঝাতে চাইছি সেটা পরিপাটিকরণ, পরিষ্করণ, ক্ষালন, শুদ্ধি বা শোধন ইত্যাদি অর্থে প্রযোজ্য, কিন্তু এসবই সংস্কার শব্দের ইতিবাচকতা। আবার সংস্কার অর্থ যখন ধারণা বা বিশ্বাস হয়ে দাঁড়ায় তখন এর শোধনবাদ বিরোধী অবস্থানই বেশি প্রকাশ পায়। এই অর্থে সংস্কারের নেতিবাচকতা মুখ্য হয়ে ওঠে। অধিকন্তু সংস্কারের অর্থ হিসেবে যখন উল্লেখ করা হয় ‘অস্ত্রাদিতীক্ষ্বীকরণ’ তখন মনে হয় সেনাদল তো নিয়তই এই সংস্কারে নিয়োজিত রয়েছেন।
অভিধান অনুসারে চললে দেখা যায় আমাদের রাজনীতিতে বর্তমানে যে সংস্কার-বিতর্ক চলছে তার প্রয়োগ মূলত শুদ্ধি বা সংশোধন নির্দেশ করে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঘোষের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ সংস্কারের এমত অনেক ধরনের অর্থ নির্দেশ করেছেন, যেমন শুদ্ধি বা মন্ত্রাদি দ্বারা শোধন, পরিষ্করণ, মার্জন, ব্যকরণাদির শুদ্ধি বা ভুল সংশোধন, জীর্ণোদ্ধার ও মেরামত। এইসব শব্দার্থ আমাদের আশ্বচ্চ করে যে, সংস্কার-ধারণা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোড়নে শব্দ ব্যবহারে কোনো ভুল বা ত্রম্নটি আমাদের দিক দিয়ে ঘটেনি। তবে অভিধান শব্দের যে-অর্থ নির্দেশ করে তার উৎস সর্বদা শব্দের প্রয়োগ, ব্যবহার ও চর্চা। আভিধানিক অর্থে মনে হতে পারে সংস্কার সর্বদাই কাম্য এবং সংস্কারকে মঙ্গল ও কল্যাণের পথ হিসেবে বরণ করতে সমাজ সদাগ্রহী হবে। সেই অর্থে সংস্কার কথাটার মধ্যে একটি ইতিবাচক মূল্যবোধ নিহিত রয়েছে। তবে জটিল সামাজিক বাচ্চবতায় শব্দার্থ যে সবসময়ে সরল পথে থাকে না সেটা রাজনৈতিক নানা অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা জানতে পারি। বিগত শতকের ষাটের দশকে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলন দুই বিবদমান শিবিরে ভাগ হয়ে গেল সংস্কারের প্রশ্নে এবং সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন শিবিরকে তাদের পতন ও পচনের নির্দেশক হিসেবে প্রতিপক্ষ চীনের নেতৃবৃন্দ অভিহিত করলেন ‘সংস্কারবাদী’ বা শোধনবাদী হিসেবে এবং মার্কসবাদী মহলে এর চেয়ে ঘৃণ্য কাজ আর কিছু হতে পারে না। এখানে সংস্কার সম্পূর্ণ এক নেতিবাচক মূল্যবোধ প্রকাশ করছে। এ-কারণেই বোধ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন যে, শব্দকে দিয়ে মানুষ অনেক মিথ্যে বলিয়ে নেয় বলে/শব্দের ওপর আমার আর আস্থা নেই।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংস্কার প্রায় সার্বজনীন আকুতি হয়ে উঠেছে এবং তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী নাগরিক কমই রয়েছেন। তবে এই সংস্কারসাধনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই এবং এখানে মাথা চাড়া দিয়েছে সংস্কারের আরেক অর্থ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঘোষ সংস্কারের এই অর্থ নির্দেশ করেছেন ‘আজন্ম ধারণা’, এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ধারণা, বিশ্বাস’। আমরা বর্তমান রাজনীতিক পটভূমিকায় একে বলতে পারি আজন্ম লালিত লোকবিশ্বাস বা লোকধারণা। এই অর্থে সংস্কার নিয়ে আমরা বিব্রত রয়েছি বটে কিন্তু এর তাৎপর্যের দিকে ততো মনোযোগী হচ্ছি না। গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ও শাসনপদ্ধতির বিকাশের জন্য সংস্কার আমাদের কাম্য এবং সেজন্য বিভিন্ন ধরনের বিবেচনা ও প্রস্তাবনা জাতির সামনে হাজির করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চার জন্য এটা বিশেষভাবে দরকার। অন্যদিকে আজন্ম ধারণা বা লোকবিশ্বাস অর্থে সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর ভিন্ন ধরনের অভিঘাত বয়ে আনে। বিশুদ্ধ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী তত্ত্বের কারবারী হিসেবে যে সমাধান কাঙিক্ষত মনে করবেন, সংস্কারের সেই প্রক্রিয়া বাচ্চব জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ভিন্ন রূপ গ্রহণ করবে লোকবিশ্বাস বা সংস্কারের কারণে। এই দুই সংস্কারের মধ্যে অনিবার্য যে দ্বন্দ্ব তা নিরসনে কোনো ফর্মুলা যে কাজ করবে না সেই ইঙ্গিত আমরা নানাভাবে পাই। জবরদস্তিতা এ-ক্ষেত্রে কোনো সমাধান নয়। জোসেফ স্ট্যালিন ছিলেন রাজনীতির লৌহমানব এবং জবরদস্তি করে মানবের হিতসাধন প্রয়াসের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন তিনি। স্ট্যালিন শাসনামলে রাশিয়ার কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে অগণিত নাগরিকের মৃত্যু ও পীড়নের পরও সমাজের প্রতিবাদী চেতনার বিনাশ ঘটে নি এবং এমনি এক প্রতিবাদী পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছিলেন ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো, লিখেছিলেন, ‘কবরে শুইয়ে দিয়ে কুঁজোকে সংশোধনের দিন চলে গেছে কমরেড।’ এই কুঁজো আসলে লোকবিশ্বাসের পরম্পরার ভার বহনকারী নাগরিক এবং তাকে সংশোধন প্রক্রিয়ায় সামিল করাটাই চ্যালেঞ্জ, জবরদস্তিতা এর সমাধান নয়।
সংস্কার ও ‘সংস্কার’-দুইয়ের সমম্বয় ঘটাবার পথ বের করবার জন্য আমরা চাই উপযুক্ত রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব সহজে বিলুপ্ত হওয়ার নয়, কিন্তু এই দ্বন্দ্বের ভারে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া বিশেষ জরুরি। আর তাই প্রশ্ন ওঠে অমীমাংসেয় দ্বন্দ্বের এক নিরসনযোগ্য কাঠামো, দাঁড় করা। সমাজে অমীমাংসেয় দ্বন্দ্বের চরম প্রকাশ হিসেবে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শাসনের প্রতিষ্ঠাতা লেনিন দেখেছিলেন রাষ্ট্রকে, তাঁর বিবেচনায় শ্রেণী দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে ভেঙে পড়া থেকে সমাজকে রক্ষা করতেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং শ্রেণীস্বার্থের অমীমাংসেয় দ্বন্দ্বকে ধারণ করতে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে বলপ্রয়োগের আধার, ক্ষমতাবান শ্রেণী স্বীয় কতৃêত্ব কায়েমের জন্য সেই মতো রাষ্ট্র তৈরি করে নেয়। আমাদের দেশের সাম্প্রতিক সংস্কার দ্বন্দ্বে লেনিন-কথিত শ্রেণীদ্বন্দ্বের অন্তঃসলিলা অবস্থান নিশ্চিতভাবে রয়েছে, তবে একে ধারণ করে চলবার পথ হিসেবে আমরা গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছি। আমাদের সংস্কার বিষয়ক দ্বন্দ্ব নিরসনেও গণতন্ত্র ব্যতীত আর কোনো অবলম্বন আমাদের নেই। লোকবিশ্বাস বা সামাজিকভাবে বিদ্যমান ‘আজন্ম ধারণা’র বশংবদ হয়ে থাকা যেমন সঙ্গত নয়, তেমনি এর উৎসাদনে জবরদস্তিতাও কোনো সমাধান নয়। এর জন্য চাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের চর্চা। সৌভাগ্যক্রমে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে দ্বিমত বিশেষ নেই; কিন্তু গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে নানা মত লক্ষ্য করা যায়। এইসব মতের একটির গতিমুখ হচ্ছে, গণতন্ত্রকে পরিবারতন্ত্রে বা গোষ্ঠীতন্ত্রে পর্যবসিত হওয়া ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হোক। এই কার্যকর ব্যবস্থা বলতে কেউ বোঝাচ্ছেন ওয়াচডগ প্রতিষ্ঠার কথা, সংগঠিত কোনো গোষ্ঠী সেই কতৃêত্ব ভোগ করবে অর্থাৎ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজন কিছুটা কম গণতন্ত্র। এর একটি মিলিঝুলি রূপ হিসেবে আসছে জাতীয় ঐকমত্যের প্রশ্ন। গণতন্ত্র যেখানে বহুমতের অবস্থান ও সংঘাতের মধ্যে চলবার পথ করে নেয় সেখানে জাতীয় ঐকমত্যের সর্বপ্লাবী গুরুত্ব মানানসই হয় না।
অপরদিকে রয়েছে নির্বাচনকে জনরায়ের প্রতিফলক হিসেবে শিরোধার্য করে অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে দেশ পরিচালনার কতৃêত্ব প্রদান। এই দাবির ন্যায্যতা নিয়ে বিরোধের অবকাশ কম, কিন্তু যে সমস্যা-সঙ্কটের মধ্য দিয়ে টালমাটাল পায়ে এগুতে গিয়ে গণতন্ত্র বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে সেই বাস্তবতার স্বীকৃতি এখানে থাকা দরকার। স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের সময় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে আমরা করে নিয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং এর কার্যক্রমের ধারায় বিশেষ পরিবর্তন ঘটাতে পারি নি। ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গোষ্ঠী-কেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক যে বৃত্তাবদ্ধ শাসন প্রচলিত ছিল গণতন্ত্র সেক্ষেত্রে বড় কোনো হেরফের ঘটায় নি, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণে যেটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল। সংস্কারের দাবি ছিল নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের স্বাভাবিক উপজাত, এর খণ্ডিত বিক্ষিপ্ত বাস্তবায়ন ঘটলেও তার কোনো সুফল দৃশ্যগোচর হয় নি।
সংস্কার তাই আমাদের কাছে দুই অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। একদিকে রয়েছে পরিশুদ্ধকরণ, পরিমার্জন, পরিশোধন অর্থাৎ, রাজনীতির বিবেচনায়, বিদ্যমান কাঠামো ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি। আবার কাঙিক্ষত এই কার্যসম্পাদনে অগ্রসর হয়ে দেখা যাচ্ছে নানারকম বাধা সেখানে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ফলে যে দৃঢ়তা ও সংকল্পবদ্ধতা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল সেখানে ভাঁটার টান পড়েছে এবং এক্ষেত্রে সংস্কারের অপর দ্যোতনা তার ছায়া ফেলেছে, অর্থাৎ লোকবিশ্বাস ও আজন্ম ধারণা যে খুব সহজে মুছে যাওয়ার নয়, সেই বাস্তবতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে দুইয়ের সমম্বয় কীভাবে সম্ভব সেটা বিশেষভাবে অনুসন্ধানযোগ্য, আর এখানেই আসে সৃজনশীলভাবে রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে বিবেচনার বিষয়। দুই ভিন্ন অর্থ নিয়ে যে-সংস্কারের প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির হয়েছে তা বাঙালির রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শ ও রাষ্ট্রভাবনার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি যখন বিপুল বিক্রম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রবল বাধা উজিয়ে অর্জন করে বিজয় তখন জাতিরাষ্ট্র গঠনের শক্তি ও দুর্বলতার দিকে আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ হওয়া দরকার ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে বিজয়ের আনন্দে অভিভূত জাতি রাষ্ট্রগঠনকে স্বতঃসিদ্ধ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছিল, আলাদা কোনো মনোযোগ এদিকে নিবদ্ধ হয় নি। এখন স্বাধীনতার সাইত্রিশ বছর পর এসে সংস্কারের জোরদার দাবির মুখে আমাদের উপলব্ধি করতে হয় রাষ্ট্রগঠনে ঘাটতি অনেক ঘটে গেছে এবং এ-কারণে বারবার আমাদের তারস্বরে বলতে হয়েছে আমরা কোনো ব্যর্থ রাষ্ট্র নই, আর এখন সমস্বরে উচ্চারণ করছি আমাদের রাষ্ট্রসত্তা ও শাসনধারায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। তবে সংস্কারকে রাজনৈতিক দল, নেতা ও ভোটের খেলার মধ্যে আবদ্ধ রাখলে আমরা রাষ্ট্রচিন্তার নিরিখে সংস্কারকে বিবেচনা করতে পারবো না। এক্ষেত্রে বাঙালির এক পথিকৃৎ রাষ্ট্রবিদ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণ আমাদের নিতে হয়। ‘স্বদেশী সমাজ’ গ্রন্থ ও আরো নানা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্যের রাষ্ট্রগঠন রীতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের ফারাক নানাভাবে তুলে ধরেছেন এবং রাষ্ট্রের বিপরীতে সমাজের শক্তির তাৎপর্য নির্দেশ করেছেন। এই সামাজিক শক্তির পরিচয় আমরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পেয়েছিলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, যখন ক্ষমতাকেন্দ্র ও শহরগুলো ছিল পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এবং সমাজ ছিল তাদের সবরকম আধিপত্যের বাইরে। আর এ-কারণে একাত্তরের পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্র অস্তিত্বহীন হয়ে পড়লে কোনো নৈরাজ্য দেখা দেয় নি; সমাজ ধারণ করে জয়মান বাংলাদেশ রাষ্ট্রসত্তাকে এবং জাতিকে পৌঁছে দেয় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে।
‘এক-চোখো সংস্কার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কারে সমম্বয় আনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে লিখেছিলেনঃ “দুই দল লোক সমাজসংস্কার করে। এক যাহারা লোকাচারকে একেবারে মূল হইতে উৎপাটন করে, আর- যাহারা লোকাচারের একটি একটি করিয়া শিকড় কাটিয়া দেয় ও অবশেষে কপালে করাঘাত করিয়া বলে, একি হইল, গাছ শুকাইল কেন? ইহাদের উভয়েরই আবশ্যক।” আমাদেরও আজ প্রয়োজন সংস্কার ও ‘সংস্কার’-এর মধ্যে সমম্বয়সাধন এবং আরো গভীরে দৃষ্টি দিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনশিল্পকে স্বদেশীয়ানা ও সৃজনশীলতার গৌরবে অভিষিক্ত করা, রাষ্ট্রের বিপরীতে সমাজের শক্তি জোরদার করা। সেটা দাবি করে প্রসারিত দৃষ্টি এবং গভীরতর বিশেস্নষণ ও বিবেচনা।
**************************
মফিদুল হক
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮