খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে বাগানে পায়চারি করতে করতে মুখে মুখে কবিতার স্তবক আওড়াতেন তিনি। কখনো রবীন্দ্রনাথ; পাবলো নেরুদা, নজরুল এমনকি বিষ্ণুদে, কখনো নিজের পুরনো কবিতা অথবা তখনই বানানো কয়েক লাইন। যার কিছু পরে লিপিবদ্ধ হয়েছে, আবার অনেক লাইনই মিলিয়ে গেছে বাতাসে। কালো অক্ষরে ঠাঁই পায়নি আর। এমন সব লাইন আওড়াতেন, কিশোর থেকে প্রবীণ যে কেউই উদ্বুদ্ধ হবে, সাহসে ভর করে বেঁচে থাকার আস্বাদ পেতে।
খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে বাগানে পায়চারি করতে করতে মুখে মুখে কবিতার স্তবক আওড়াতেন তিনি। কখনো রবীন্দ্রনাথ; পাবলো নেরুদা, নজরুল এমনকি বিষ্ণুদে, কখনো নিজের পুরনো কবিতা অথবা তখনই বানানো কয়েক লাইন। যার কিছু পরে লিপিবদ্ধ হয়েছে, আবার অনেক লাইনই মিলিয়ে গেছে বাতাসে। কালো অক্ষরে ঠাঁই পায়নি আর। এমন সব লাইন আওড়াতেন, কিশোর থেকে প্রবীণ যে কেউই উদ্বুদ্ধ হবে, সাহসে ভর করে বেঁচে থাকার আস্বাদ পেতে।
কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী, ছিলেন যিনি সাহসিকতার প্রতীক, উদ্দীপনার অগ্রনায়ক। জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে দেদীপ্যমান হয়ে আছেন এই ভূখন্ডে। জীবন-মৃত্যুর সেতুর মাঝখানে বা কিনারে দাঁড়িয়ে তিনি কখনো ‘প্রস্থান’-এর গান কিংবা গল্প শোনাননি। বরং জীবনকে প্রাণবন্ত আরো, সজীব, কর্মময়, আলোকিত, বিকশিত, প্রস্ফুটিত করার প্রেরণাই যুগিয়েছেন নিরন্তর। তাঁর সব আয়োজনই ছিলো জীবনকে ঘিরে। জীবনের মানবিক ও শিল্পিত বিকাশ চেয়েছেন তিনি। বলতেনও তিনি “মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাঁর জীবন। এই বাঁচার সুযোগ বারবার আসেনা। সুতরাং এমনভাবে বাঁচতে হবে যেন বছরের পর বছর উদ্দেশ্যবিহীন বিভ্রান্তিতে দগ্ধ হয়ে না মরতে হয়।” এই আদর্শকেই তিনি লালন করেছেন। সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। পেরেছেনও। আশি পেরিয়ে যাওয়া বয়সেও সবার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। সাহসে বুক বেঁধে দীপ্ত পায়ে হেঁটে গেছেন সবখানে। যেখানেই প্রয়োজন সাহস, সেখানেই ছিলেন তিনি সক্রিয়। অল্পবয়সে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ভেঙে ভেঙে নিজেকে খোলসমুক্ত করে খোলা আকাশের নীচে দৃঢ় পদক্ষেপে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
সাহস তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে একুশের প্রথম কবিতা, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’। ‘৪৭ সালে দেশ বিভাগ, ‘৫০-এর দাঙ্গা, পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী স্বাক্ষর সংগ্রহ, বিশ্বশান্তির জন্য পরিষদ গঠন, এই সব কিছুতেই সাহসের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে কঠিন বাঁধা অতিক্রম করেছেন। অতিতরুণ বয়সেই প্রকাশ করেছেন সাহিত্য পত্রিকা ‘সীমান্ত’। চট্টগ্রামে তাঁর উত্থানকালে ছিলেন তিনি প্রাগ্রসর এক প্রগতিমনস্ক সমাজ সংগঠক। রাজনীতিতেও ছিল নিবেদন। দৈনিক সংবাদপত্রও প্রকাশ করেছেন। গান, নাচ, নাটক, আবৃত্তি সবখানেই ছিলেন উদ্যোক্তা-সংগঠক। নিজে গান লিখে গেয়েছেনও। মানবকল্যাণের ব্রত তাঁকে সম্পন্ন মানবের অবয়ব দিয়েছিল বৈকি।
একুশ মানে যে মাথা নত না করা- তা দেখেছি কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জীবনে। অন্যায়ের কাছে, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, হীনমন্যতা, ধর্মান্ধতার কাছে নত বা আপস নয় বরং এসবের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর নিরন্তর লড়াই। সাংগঠনিক শক্তিমত্তার পাশাপাশি লেখনীসত্তাকেও এগিয়ে নিয়ে গেছেন। শাসক বা প্রাতিষ্ঠানিকতার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেবার মানুষ ছিলেন না, বরং সাহসের সঙ্গে কুশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। হুলিয়া মাথায় নিয়েও স্তব্ধ হয়ে যাননি। সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার তাঁকে অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে উৎসাহ যুগিয়েছে।
এমনই মানুষ কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী যে, বয়সের পার্থক্যরেখা তাঁর জন্য কোনো বাঁধা ছিল না। অনায়াসে শিশু থেকে প্রবীণ - প্রবীণা যে কারো সাথেই সাবলীলভাবে মিশে যেতে পারতেন। প্রখর স্মৃতি সম্পর্ক রক্ষার ব্রতকে সবল করেছে। একবার দেখা হওয়া মানুষকে সহজে ভুলে যেতেন না। যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতেন নিজে থেকেই। মানুষের কুশল সংবাদ তাঁকে বুঝি অনুপ্রাণিত করতো; জীবনের প্রতি আরো বেশি সন্নিষ্ঠ হবার তাগিদে। যে কোনো সাফল্যের পেছনে কারো না কারো অনুপ্রেরণা থাকে। মাহবুব উল আলমের জীবনে এই অনুপ্রেরণা সমাজ থেকে যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে নিত্যসঙ্গী বুলবুল ভাবীর কাছ থেকেও। দু’জনেই যে আলোকিত মানুষ, সান্নিধ্যে এসেছেন যারা, তারাই তা উপলব্ধি করেছেন। কবির স্বপ্ন ও দর্শনকে এগিয়ে নিতে স্ত্রীর অপরিসীম অবদান অতুলনীয়। তাঁরা আসলেই আমাদের নিত্য প্রেরণা।
মৃত্যু তাঁকে বিচলিত করেছে নানা সময়ে। ভাষা শহীদদের আত্মদানে তাড়িত হয়ে লিখেছেন কবিতা। দাঙ্গার বিরুদ্ধে পুস্তিকাও লিখেছেন। ৫০ এর মম্বন্তরের সময় শত-শত মানুষকে অনাহারে মারা যেতে দেখেছেন। একাত্তরের গণহত্যাও দেখেছেন। মৃত্যুর অসীম পাথারে দাঁড়িয়েও তিনি গেয়েছেন জীবনেরই গান। বেঁচেছেন শাণিত তরবারিরৃ মতো। সবকাজেই ছিলেন অগ্রগামী। পিছপা হবার মানুষ ছিলেন না। যখন যা প্রয়োজন, সেখানেই বাড়িয়েছেন হাত। কখনো সহযোদ্ধার, কখনো সহমর্মিতার, সহানভুতির, উদ্দীপনার।
শিশুর সরল হাসিটি তাঁর মুখে লেগে থাকতো পরিণত বয়সেও। শিশুদের জন্য ছড়া লেখার কাজটিও তিনি করেছেন সযত্মে। ছেলে ভোলানো নয়, ছেলে জাগার এবং যুদ্ধে যাবার ছড়া লিখেছেন। সংবেদনশীল কবিসত্ত্বার অধিকারী মানুষটির সাণ্নিধ্য মিলেছে যতক্ষণ, পুরোটাতেই থাকতো নিত্যনতুন স্বপ্নের কথকতা, সেই সাথে অতীতের স্মৃতিময় ইতিহাসবাহী দিনগুলো। নির্যাস মিলতো অনেক অজানা, অদেখা, অচেনা মানুষ ও ঘটনার। যারা মূর্ত হয়ে উঠতেন কবির বর্ণনায়। পুষ্পের ফুটে ওঠা থেকে বৃক্ষের ডালপালা সবই ছিল তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ব্যাঙের সর্দ্দিজ্বর নিয়ে রসালো গল্পও ফাঁদতেন। তার ভেতরের কাব্যসত্বাটিকে অনায়াসে পাওয়া যেতো। আমাদের তো এমনও মনে হয়েছিল জীবনকাহিনী শুনে যে, হয়তো তিনি খাঁটি বোহেমিয়ান। কিন্তু যতোই কাছাকাছি, যতোই নৈকট্যে আসা,ততোই স্পষ্ট হয়েছে সমাজমনস্ক মানুষটি সৃষ্টির যন্ত্রণায় কাতরান। একজনমে যা করেছেন, তা হয়তো অন্যদের ক্ষেত্রে দশজনম লেগে যেতো।
সদালাপী স্নিগ্ধ অমায়িক মানুষ কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে জ্বরাও কর্মের গন্ডি থেকে সরাতে পারেনি। তাঁর সৃজনশীলতা এবং উজ্জ্বল্য অবশ্য অনুকরণীয় হলেও তা সহজে ধারণ করা সুলভ নয়। তাঁর প্রয়াণ ঘটেছে পরিণত বয়সেই। কিন্তু দীর্ঘদিন জ্বরা; বার্ধক্যকে পেছনে ফেলে রেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি সামনের দিকে। বলতেন সেই সংস্কৃত শেস্নাক- ‘ব্রাত্য স্বংপ্রাণ-’ (হে প্রাণ,তুমি জঙ্গম, তুমি চল। এগিয়ে চল- সামনের দিকে)। আরো বলতেন কবি, ‘জীবনের যে ক‘টা দিন বেঁচে আছি, মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বেঁচে থাকতে চাই’ এবং ছিলেনও তাই। মৃত্যু নিয়ে যে তাঁর ভাবনা ছিলনা, তা নয়। তবে মৃত্যুকে সহজভাবে আলিঙ্গন করার স্পর্ধা যে ছিল, তা তাঁর কবিতা,গদ্যে প্রকাশও পেয়েছে। ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে ২০০৩ সালে ‘এতো ভালোবাসা রাখবো কোথায়’ কবিতায় লিখেছেন তিনি, “মৃত্যুকালে যেন কলুষিত কোনো হাতের স্পর্শ/ আমাকে বিষন্ন করতে না পারে।”/ এখানেও সেই সাহসে বুক বেঁধে এগিয়ে যাওয়া মানুষটিকে খুঁজে পাই আমরা।
ছিলাম যারা নানা সময়ে কাছাকাছি, সান্নিধ্যের উষ্ণতায় তৃপ্ত, জীবনের জয়গানে উদ্দীপ্ত, তাদের কাছে ছিলেন তিনি হিমালয়সম এক মানব। হ্নদয়ের দু’কূল ছাপিয়ে অজান্তে টেনে নিতেন কাছাকাছি। জীবনের সফলতা তাঁর কাছে অন্যরকম। সে তাঁর ১৯৫৭ সালে লেখা কবিতায় এসেছেও। অর্থ, খ্যাতি এ সব সাফল্য হিসেবে তাঁর কাছে ধরা পড়তো না। কাঁদা ঘেটে জীবনের দীর্ঘপথ হাঁটার আগ্রহী ছিলেন না। সমাজের রূপান্তর চেয়েছিলেন বুঝি। এক জীবনে অনেক কিছু করার যে ক্ষমতা তা মাহবুব উল আলম চৌধুরী পেরেছেন নিজস্ব আত্মশক্তির উদ্বোধনে। হয়েছেন নিজেই তাই একটি প্রতিষ্ঠান, একটি ইতিহাস। সেই তিনি নতুন কবিতা লেখা হলে টেলিফোনে শোনাতেন স্বজন, প্রিয়জন, ঘনিষ্ঠজনকে। মতামত নিতেন। একেকটি সৃষ্টির পেছনে তাঁর নিবেদন ছিল অনেক বেশী। কবিতা নিয়ে ভাবনাটা ভিন্নরকমই ছিল। চল্লিশের দশক থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। যে কারণে সে সময়েই চট্টগ্রাম থেকে বের করেছিলেন ‘সীমান্ত’ নামে সাহিত্যপত্র; ঊনিশ বছর বয়সেই।
পরিণত বয়সে এসে মৃত্যুর কথা যে ভাবতেন না তা নয়। মানব জীবনের এই অনিবার্য পরিণতির বিষয়টি নিয়ে হা হুতাশা ছিল না। তবে বীরের মতো মৃত্যুকে বরণ করার আকাঙ্খা ছিল। ২০০৭ সালের ঈদ উল আজহার পর চলে গেলেন তিনি। আকস্মিক এই বিদায়ের জন্য কি ছিল কোন পূর্ব প্রস্তুতি? তবে বছর খানেক আগেই মৃত্যুকে নিয়ে তাঁর কথকতা-ভাবনাকে পাওয়া গিয়েছিল। নতুন কবিতা লেখা হলে মাঝে মাঝে যেমন শোনাতেন নিবিষ্ট শ্রোতাদের, সে রকম ২০০৬ সালের ঈদ উল আযহার আগে শুনিয়েছিলেন কবিতা। যেখানে এই চলে যাওয়ার চিত্রটা তুলে এনেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন বোধহয়; যাবার দিনগুলো ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে। তাই আকাঙ্খাগুলো যেন প্রকাশিত হয়েছিল এই বিদায়ের শিল্পিত সুষমায়। এক ভরদুপুরে খুব গম্ভীর স্বরে বলেছিলেন, ‘শোনো, একটা মর্মঘাতী কবিতা লিখেছি দু’দিন আগে। কোথাও ছাপার জন্য দেবো। তার আগে তোমাকে শোনাতে পারি, জাতীয় একটি দৈনিকের ঈদ উল আযহার বিশেষ সংখ্যায় ছাপা ূসবুজ মাটির টানেৃ কবিতাটির ফটোকপিও পেয়েছিলাম।
কবি মাহবুব ভাই, যিনি আমাদের তারুণ্যের সময় প্রেরণা যোগাতেন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি। যাঁকে কাছ থেকে, দূর থেকে দীর্ঘদিন দেখে এসেছি। ‘কুয়াশায় বীজ বুনে চলে গেছে চাষা’র মতো উল্ল্যেখযোগ্য লাইনের লেখক মাহবুব ভাই বোধ হয় বুঝতেন, তাঁর বুনে যাওয়া বীজে অংকুরিত বৃক্ষগুলো ছায়া দেবে মানুষকে। যে মানুষের জন্য তাঁর প্রাণের আকুতি তীব্র। তাঁর কণ্ঠে নিঃসৃত সেই ‘সবুজ মাটির টানে’ কবিতাটি আজো অনুরণিত হয়। লিখেছেন তিনি “শেষ কদমটা ফেলার আগে/ প্রিয়জনকে দেখে যেতে চাই/ যারা দীর্ঘ সংগ্রামে আমার সাথী ছিল/ তাদের অনেকেই আজ নেই।”/ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে মাঝে মাঝেই পুরনো সঙ্গী-সাথীদের কথা বলতেন। কবিয়াল রমেশ শীল কিংবা চিত্রশিল্পী সোমনাথ হোড়, যোগেন চৌধুরী, নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের কথা যেমন জেনেছি, তেমনি কবি পাবলো নেরুদার সান্নিধ্যের স্মৃতি আমাদের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচনই করতো। কবিতাটিতে বলেছিলেন তিনি, “চলে গেলে তবু রেখে যাব তোমাদের মাঝে নিজেকে।” হ্যাঁ, তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন এদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতির ইতিহাস জুড়ে। কবিতাটি শুরু করেছিলেন এভাবে, “একখন্ড সবুজ মাটি আমাকে টানছে/ আমি জানি না, সেই মাটি কোথায়, কত দূরে,/ এক পা এক পা করে আমি/ সেই সবুজ মাটির দিকে হেঁটে চলেছি।/ কদমের শক্তি হ্রাস পেয়েছে,/ তবুও জোরে জোরে হাঁটার তাগিদ আসছে/।”
হেঁটেছেনও তারপর বছরখানেক। ৮১তম জন্মদিনও পালন করেছেন গত বছরের (২০০৭) ৭ নভেম্বর। উত্তরার ‘সীমান্ত’ নামক বাড়ীর সামনের সড়ক ধরে ভোরে কিংবা বিকেলে হেঁটে বেড়াতেন। দু’একজন সঙ্গী-সাথীতো থাকতেনই। সভা-সমাবেশ কোনো কিছুতেই অংশ নেয়ার কমতি ছিল না। থেমে থাকা, গতিহীনতা তাঁকে স্পর্শ করেনি। তাই চলে যাবার আগেও আহ্বান ছিল “মৃত্যুর সাথে জীবনের লড়াই।/ চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও।/ দেশে হাজার হাজার ম্যাগনোলিয়া/ ফোটাবার লড়াই চালিয়ে যাও/” (সবুজ মাটির টানে)।
ফুলের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ ছিল তাঁর। চট্টগ্রামের এনায়েত বাজারের বাড়ি জুড়ে ফুলেরা ফুটতো যেন কবির ভালোবাসাকে উসকে দিতে। ঢাকার বাড়িতেও পুষ্পচর্চা ছিল তাঁর অতি আপনার। ম্যাগনোলিয়া ফুলের প্রতি ছিল দুর্বলতা । যদিও ফুলটি মানুষের জীবনের মতো ক্ষণস্থায়ী। তবে সৌন্দর্য, সৌরভে চারদিক আলোকিত করে রাখে। প্রশ্নও উঠেছিল, ম্যাগনোলিয়া নামের কোনো নারী কি এসেছিলো তার জীবনে?’ নিজের বাগানে ম্যাগনোলিয়ার চারা লাগিয়েছিলেন। ভাবতেন; এই গাছের ফোটা ফুল দেখে যেতে পারবেন কিনা! অবশ্য দেখতে না পাবার জন্য আক্ষেপ ছিল না। “নাইবা আমার দেখা হলো, আমার নাতিরা তো রইল।/ যারা এই ফুল ফোটা দেখে/ তিলে তিলে প্রেমিক হয়ে উঠবে।/ বলবে, নানা, চারা গাছটি লাগিয়েছিলেন বলে/ আমরা এই ফুল ফোটা দেখতে পাচ্ছি/ আর আমরা নানার আত্মাকে/ প্রতিদিনের ফুল ফোটার মধ্যে যেন খুঁজে পাই”।/ অটোয়ার টিউলিপ উৎসবকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর এই পুষ্পপ্রীতি।
ফুলের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকতে চান। অর্থাৎ সৌন্দর্য, সৌরভে আলোকিত করে দিতে চান সবকিছুকেই। এ রকম আকাঙ্খা তিনিই করতে পারেন। কারণ ফুলের মতোই নিজেকে বিকশিত করেছিলেন। তাই ফুল হয়েই যেন বেঁচে থাকতে চান। মানুষ যেনো খুনের বদলে ফুলের দিকে তাকায়, এই কামনা করতেন। হিংস্রতা, নৃশংসতা, রক্ত, দাঙ্গা দেখেছেন জীবনের শুরু থেকেবই। তাই এসবের বিপরীতে করেছেন মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও সুন্দরের পূজা। তাইতো আশা করতেন, মানুষ আরো বেশি করে ফুলের চারা রোপন করবে। আর সেসব ফুলের আলোয় আলোকিত হবে এই পৃথিবী। ফুলের মধ্যে স্বর্গীয় সুষমা পেতেন তিনি। সেই সুষমাই ছড়াতে চেয়েছেন সবার মাঝে। আলোকিত পৃথিবীর জন্য ছিল তাঁর নিরলস শ্রম। সংকল্পবদ্ধ দীপ্ত মুখে লড়াই করেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আপসহীনতা, কলুষতা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছিল তাঁর নিরন্তর। দেশকে ভালোবাসতেন বলেই দেশের মানচিত্রের সবুজের মতো মাটিকেও ভাবতেন সবুজ। যে সবুজ মাটি তাঁর বাসনার পথ ধরে টেনে নিয়েছে তাঁকে আঁকড়ে রেখেছে বুকে। মিশে গেছেন তিনি তাঁর প্রিয় দেশের সবুজ মাটিতে। মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে আসা কবি মাহবুব উল আলম মৃত্যুকে সহজেই ধারণ করেছিলেন।
সেই ‘৫২ সালে একুশের প্রথম কবিতায়ই তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে/ প্রতিরোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।” ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যতদিন থাকবে, ততোদিন অম্স্নান থাকবেন কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী ও তাঁর সৃষ্টি। আমাদের প্রাণের পতাকা জুড়েও পতপত করে উড়বে তাঁর অমর কাব্য। লিখেছিলেন তাই ২০০৭সালের ১২ জুলাই ‘আমি তোমাদের সাথে আছি।/ তোমাদের সাথে মরি-বাঁচি।/’ কিংবা “সাহসী বুকে শক্তি ধরো/ নিজেরে করো জয়।/” (আমি যদি চলে যাই বন্ধ করোনা লড়াই)। কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী দূর থেকে হলেও অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
**************************
মুহম্মদ সবুর
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮