National Events - http://events.amardesh.com
একুশের পটভূমি
http://events.amardesh.com/articles/100/1/aaaaaa-aaaaaa/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 02/26/2008
 

বাংলাদেশে চিন্তাচেতনার ধারা বিশেষ কোন ছকে আবর্তিত না হলেও এর মূলস্রোত ও সামষ্টিকতায় একটা ঐক্য লক্ষ্য করি। ঊনিশ শতকে নানা আঞ্চলিক, সম্প্রদায়গত, পেশানির্ভর, সমাবেশ ও সংগঠনগত বিরোধ-সংঘাত, দ্বন্দ্ব-মতদ্বৈধ, হিংসা-অসুয়ার ফলে সভা-সমিতি-আঞ্জুমানে তিলকে তাল করায় পরিস্থিতি মারামার-কাটকাট পর্যায়েও চলে যেত। মুসলমানদের নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়-উপসম্প্রদায়ের হাতাহাতি-লাঠালাঠি ব্যাপার কিছু কম ঘটেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব জটিল বিদ্বেষ-বিবাদের অবসান ঘটেছে। ওহাবি-ফরায়জি-আহাম্মদি সমাজের তীব্র অবস্থান শিথিলও হয়েছে।


একুশের পটভূমি

বাংলাদেশে চিন্তাচেতনার ধারা বিশেষ কোন ছকে আবর্তিত না হলেও এর মূলস্রোত ও সামষ্টিকতায় একটা ঐক্য লক্ষ্য করি। ঊনিশ শতকে নানা আঞ্চলিক, সম্প্রদায়গত, পেশানির্ভর, সমাবেশ ও সংগঠনগত বিরোধ-সংঘাত, দ্বন্দ্ব-মতদ্বৈধ, হিংসা-অসুয়ার ফলে সভা-সমিতি-আঞ্জুমানে তিলকে তাল করায় পরিস্থিতি মারামার-কাটকাট পর্যায়েও চলে যেত। মুসলমানদের নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়-উপসম্প্রদায়ের হাতাহাতি-লাঠালাঠি ব্যাপার কিছু কম ঘটেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব জটিল বিদ্বেষ-বিবাদের অবসান ঘটেছে। ওহাবি-ফরায়জি-আহাম্মদি সমাজের তীব্র অবস্থান শিথিলও হয়েছে। ফলে চলে গেছে ধর্মীয় বাহাস-বিতর্ক-ফ্যাকড়া-ফতোয়ার নিত্যনৈমিত্তিক সংঘাত। সামাজিক শান্তি ও সুস্থিরতা সৃষ্টির এ প্রক্রিয়ায় উনবিংশ শতক ও বিংশ শতকের প্রথমার্ধের আলেম সমাজের বিবেচক ও প্রজ্ঞামান অংশের অবদান বিশেষভাবেই স্মরণীয়। প্রকৃতপক্ষে আলেম সমাজের একটি বিচক্ষণ অংশের মধ্যে দেশ চেতনা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির বোধ জাগ্রত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত একটা সামাজিক সংহতির মধ্যে সুস্থির হতে থাকে। দেশ-সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতি এমনকি স্বাধীনতা-চিন্তা একটা বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে রূপ নিতে শুরু করে। চিন্তা-চেতনার বলয়ের এই সামগ্রিকতা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত ক্ষুদ্র বিবেচনাকে ঢেকে দিতে সক্ষম হয়। গোটা দেশে একটি মূলধারার সাংস্কৃতিক ও জাতীয় চিন্তা প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে। হাজী শরিয়তউল্লাহ থেকে শুরু করে মওলানা কেরামত আলী, মুন্সি মেহেরুল্লাহ, রেয়াজ অলদীন আহমদ মাশদাদী, রেয়াজ উদ্দীন আহাম্মদ, নইমুদ্দীন, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ। ইসলামি কাঠামোর মধ্যেই একটি সামগ্রিক জাতীয় সংস্কৃতির রূপরেখার সন্ধানে নানামুখী তৎপরতায় লিপ্ত হন। এঁদের ধারায় সামান্য কিচু ভাগ-বিভাগ থাকলেও এর মধ্য দিয়ে একটি মূলধারা গড়ে উঠতে থাকে এবং এঁদের মধ্যে যারা সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত তারা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম, শিক্ষার প্রসার ও বাংলা সাহিত্যে মুসলমান বাঙালির একটি নিজস্ব ধারা সৃষ্টির অনুকূলে কাজ করতে থাকেন। এঁদের হাতে সাংবাদিকতা এ ধারাকে জনসংলগ্ন করে দেয়। ফলে আলেম-ওলামা সমাজের মধ্যে একটি বুদ্ধিজীবী সমাজ তৈরি হয়। মওলানা আকরম খাঁ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, শেখ আবদুর রহিম প্রমুখ এ ধারার অগ্রণী চিন্তাবিদ। আকরম খাঁর আজাদ পত্রিকা, শেখ আবদুর রহিমের সাহিত্য রচনা, মওলানা মনিরুজ্জামানের নেতাজী সুভাষ বসুর ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান বাঙালি মুসলমানকে তাদের ধর্মীয় সত্তা বজায় রেখেও ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের অংশীদার করে। ফলে বাঙালি মুসলমানের দেশসংলগ্নতা ও বাঙালি-সংস্কৃতির একটা অন্য অংশকেও সামনে আনে। মওলানা আকরম খাঁর ‘মুস্তফা-চরিত’ এই ধারার একটি ধ্রুপদী ও যুক্তিবাদী কাজ। অন্যদিকে তার আজাদ পত্রিকা ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’ বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে আত্মসচেতনতার পথে সংগঠিত করে। সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের যোগদানের ফলে মুসলিম লীগ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নতুন শক্তি অর্জন করে জনসমাবেশে প্রভাব ফেলে এবং এই সংগঠিত জনশক্তিকে ব্যবহার করে দিনে দিনে শক্তি অর্জন করে।

এরই মধ্যে নতুন ও প্রগতিশীল ধারা সৃষ্টির চেষ্টা করেন এ কে ফজলুল হক ও তার অনুসারী কৃষক প্রজা পার্টির নতুন নেতৃবৃন্দ যথা মনিরুজ্জামান ইসলালামাবাদী, হুমায়ুন কবির, শামসুদ্দীন আহমদ, আবুল হাশিম, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ নেতা। কমরেড মুজফফর আহমদ ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম, এ কে ফজলুল হক পরিচালিত ‘নবযুগ’ দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের পর এ নবতর ভাববিপ্লবের সূত্রপাত হয় বঙ্গীয় নবপ্রজন্মের মুসলমান সমাজে। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লবের প্রভাবে আপ্লুত হয় বাংলাদেশের নতুন বাঙালি মুসলমান সমাজ। একদিকে অগ্রসর হিন্দু সমাজের বিপুল স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ইংরেজ খেদাওয়ের গান্ধীজি, চিত্তরঞ্জন, নেহরু, সুভাষের আন্দোলন, অন্যদিকে প্রধানত মুসলমানদের খেলাফত-মুসলিম লীগের আন্দোলনে সারা ভারত তখন টালমাটাল। সব মিলিয়ে সারা ভারতে তখন এক গুণগত পরিবর্তনের অবস্থা। ১৯৩৭-এর নির্বাচনে এ কে ফজলুল হক বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের ‘বেঙ্গলপ্যাক্ট’ সম্পননআয় রাজনীতি যে বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়ীকতার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রস্তাবকে তার সামনে ঝুলিয়ে দেয়ায় এক ভিন্ন রাজনীতি ও স্বার্থচিন্তা তখন পূর্বেকার নানান শ্রেয় উদ্যোগকে গ্রাস করে ফেলে। তবে ফজলুল হকের দুইটি মন্ত্রিসভার আমলে রাজনীতির বড় পরিবর্তন ঘটে যায়। বাংলায়, বাংলা ভাষায় অ্যাসেম্বলিতে বক্তৃতা, গ্রামীণ জোতদার ও কৃষক প্রতিনিধিদের আইনসভায় স্থান লাভ, পোশাকআশাকের ভিন্নতা সব মিলে বাঙালির রাজনৈতিক অঙ্গনকে একটি বাঙালি ছোপে স্বাতন্ত্র্য দান করে।

এই ভিত্তি রচনা হয়েছিল বলেই পাকিস্তানবাদের জজবার মধ্যেও ড· মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুজিবুর রহমান খান, ‘পাকিস্তান’ নামক বইয়ে, আবদুল হক, মাহবুব জামাল জাহেদী এবং সোহরাওয়ার্দীর ইত্তেহাদ বা মৌলবী মজিবুর রহমানের কমরেড’ পত্রিকা পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়।

আরো মজার ব্যাপার এই যে, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাড়িতে এবং স্কুলে উর্দু বললেও তার বাংলা লেখালেখি বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণে এক তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। বাংলা ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে যুক্তিপূর্ণ, তাত্ত্বিক প্রবন্ধটিও লিখেন এককালের মাদ্রাসার ছাত্র প্রগাঢ় পণ্ডিত ড· মুহম্মদ এনামুল হক। ইসলাম ও বাঙালির সংস্কৃতি সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান থাকায় তার পক্ষে অমন অমোঘ যুক্তিপূর্ণ ও দৃষ্টি উন্মোচনকারী প্রবন্ধ লেখা সম্ভব হয়। কবি বেগম সুফিয়া কামালের পরিবারেও উর্দু ভাষার চর্চা ছিল, তেমনি আবুল ফজল ছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র।

আবু জাফর শামসুদ্দীন এবং শওকত ওসমানও ছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র। অথচ এঁদের কাছ থেকে বাংলা ভাষা ও একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন কী অসামান্য সমর্থন ও আন্তরিক সাহায্য পেয়েছে আমরা সকলেই তা জানি। অতএব প্রকৃত পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান যিনি অর্জন করেন তিনি কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত তা কখনো বড় হয়ে দেখা দেয় না। জ্ঞানের কোন ক্ষুদ্র সীমা বা প্রকার নেই। জ্ঞানকেন্দ্র মাত্রই প্রকৃত বুদ্ধি-বিবেচনা ও মানব-বিকাশের উৎসমুখ খুলে দেয়। এঁদের সাধনা এই সর্বব্যাপী জ্ঞানেরই সাধনা। ১৯২০-এর দশকে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের কাজী আবদুল ওদুদ, মনীষী আবুল হোসেন, কবি আবদুর কাদির এবং বিজ্ঞানী-সাহিত্যিক ড· কাজী মোতাহার হোসেনের বৃদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে কৃতী পুরুষেরা তাদের শিখা পত্রিকার মাধ্যমে মানবতন্ত্রের সাধনা ও চিন্তাচর্চায় স্বাধীনতারই অম্বেষণ করেছিলেন। এসব আন্দোলন বাঙালির ভাষার লড়াই ও স্বাধিকার বোধকে জাগ্রত করেছিল। নগরবাসী শিক্ষিত সমাজের এই চিন্তাচর্চার বাইরে বৃহৎ বাংলায় লোক-কবি, কবিয়াল, বয়াতি, গায়ক, বাউল-ফকির-বৈষ্ণব, মুর্শিদ-সুফিরা যেভাব আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তার প্রভাব ছিল আরো বিপুল ও কার্যকর। এই সমম্ববাদী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মিলনকামী সাধকরা গোটা গ্রাম-বাংলায় এক মিশ্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি গড়ে তোলেন। এদের বিবেচনায়ও মানুষই শ্রেষ্ঠ। লালন ফকির মানুষকে ‘রতন’ বলেও আখ্যা করেন।

তাই গ্রাম-বাংলার নিরক্ষর মানুষও এই মানবতাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতকের নগরবাসী হিন্দু বাঙালী বিদ্বানের রেনেসাঁ ভাবনা এঁদের স্পর্শ করেনি। বরং এই গ্রামীণ লোক-সংস্কৃতির সাধকরাই গোটা ভূ-বাংলায় এক ধরনের মানবিক জাগরণের সৃষ্টি করেন যা ছিলো তাৎপর্যময়। একুশের মহান ভাষা আন্দোলন এসব নানা সাংস্কৃতিক ভাব-বিপ্লব ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির সাধনার সঙ্গে সমকালীন আর্থ ও রাজনৈতিক বিষয়ের সমম্বয়ের ফসল।

একুশে ফেব্রুয়ারির বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উপ-প্লবের সৃষ্টি হলেও এর সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটেছে শত সহস্র বছরে নানা পর্যায়ে অতিক্রম করে। একুশে তাই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতির জাতিত্ব প্রতিষ্ঠার এক সোনালি সোপান; ভবিষ্যৎ সমম্বিত সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ভিত নির্মাণ। এরপরও বহু সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষায় পূর্ববঙ্গের বাঙালি একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি শাসকদের রাজনীতিকে লড়াইয়ের মাধ্যমে পরাস্ত করেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে অর্জন করেছে। পাকিস্তানি শাসক জিন্নাহর উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার অপপ্রয়াসকে একুশের বিশাল ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের দ্বারা পরাস্ত করা না গেলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা খুবই কঠিন হতো। একুশে তাই মূল ও ভিত্তিমূল গড়ার মৌলিক এক বিজয়ের নাম।

**************************
শামসুজ্জামান খান
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮